ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদিও ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, টুইট, বিমানবাহী রণতরি, কোনো আদেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দখল করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে।’ তার দাবি, প্রণালী কখন বন্ধ হবে বা খুলবে, সে সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। তেহরান বলেছে, হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, আছে এবং থাকবে।
শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর ‘খুব শিগগিরই’ তিনি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে প্রণালীটি কার্যত মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা অবরোধ করেছি। আমরা চাইলে কোনো জাহাজকে পার হতে দেব, আর না চাইলে দেব না।’ এরপর তিনি দাবি করেন, কার্যত হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের মতোই হয়ে গেছে। তবে সামুদ্রিক নেভিগেশন তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও কিছু জাহাজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বক্তব্য দেওয়ার সময় হাসছিলেন। ওয়াশিংটন থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক কিম্বারলি হ্যালকেট বলেন, ট্রাম্প নিজেও মন্তব্যটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলছেন বলে মনে হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বাস্তবে কার্যকর রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানের কড়া জবাব
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের কর্মকর্তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং হরমুজ প্রণালী ইরানের বলে দাবি করেন।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদিও ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, টুইট, বিমানবাহী রণতরি, কোনো আদেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দখল করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে।’ তার দাবি, প্রণালী কখন বন্ধ হবে বা খুলবে, সে সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে।
তবে হরমুজ প্রণালীকে শুধু ইরানের জলসীমা হিসেবে দেখাও পুরোপুরি সঠিক নয়। কৌশলগত এই জলপথের বিভিন্ন অংশ ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। ফলে প্রণালীটিকে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করার দাবি আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

ইরান এরই মধ্যে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অবস্থান জোরদার করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। ফলে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সামুদ্রিক চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে ইরান
হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে। প্রণালীর অপর উপকূলীয় দেশ ওমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান ও মাসকাটের আলোচনা শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
তবে প্রণালী পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে জুনে করা সমঝোতার অধীনে নৌ অবরোধ ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
ট্রাম্পের ঘোষণা কি বাস্তবে সম্ভব?
ট্রাম্পের বক্তব্য এখন পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক ঘোষণা বা হুমকি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা জানানো হয়নি।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের সঙ্গে সম্পর্কিত জলসীমার মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ভূখণ্ড ঘোষণার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তৈরি করবে।
এরই মধ্যে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ এখন সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।