ক্রিডোর প্রতিবেদন
বিএনপি সরকারের ৬ মাসে ৭ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

গুলি, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ
বাংলাদেশে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৭ জনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের ভিত্তিতে ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টার (ক্রিডো) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৭ জনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের ভিত্তিতে ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টার (ক্রিডো) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ক্রিডোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসকের হিসাবে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর শ্রেণিতে ৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে একটি ঘটনাকে পুলিশ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেটি বাদ দিয়ে ৭টি মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে ক্রিডো।
তবে সব ঘটনা একই ধরনের নয়। কোনো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু হয়েছে, কোনো ঘটনায় অভিযানের সময় মৃত্যু হয়েছে, আবার কয়েকটি ঘটনায় হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর বক্তব্যও রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবার বা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না।
বান্দরবানে সেনাবাহিনীর অভিযানে মৃত্যু
২৩ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-মূল) সশস্ত্র সদস্যদের গোলাগুলির ঘটনায় হ্লামংনু মার্মা নামে একজন নিহত হন।
সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেদিন বিকেল ৫টার দিকে রোয়াংছড়ির মুরং বাজার এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানোর সময় জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা সেনা টহল দলের ওপর গুলি চালায়। সেনাসদস্যরা পাল্টা গুলি চালিয়ে তাদের ধাওয়া করেন। পরে ঘটনাস্থলে হ্লামংনু মার্মাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, হ্লামংনু মার্মা জেএসএসের সশস্ত্র সদস্য ছিলেন। তার কাছ থেকে একটি সাবমেশিনগান, গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পরে তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
তবে ঘটনার বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদে ভিন্ন বর্ণনাও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ক্রিডো।
নওগাঁয় পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ
গত ৪ মার্চ নওগাঁর মহাদেবপুরে আব্দুল হামিদ ওরফে ধলা নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। তার বয়স বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে আব্দুল হামিদকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তাকে টানাহেঁচড়া ও লাথি মারা হয়। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে অভিযোগ করা হয়।
ঘটনাটি পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার আগে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ হিসেবে সামনে আসে। তবে এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে দায় স্বীকারের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মাগুরায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মৃত্যু
গত ১২ এপ্রিল মাগুরার মহম্মদপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানের সময় আকুব্বর মোল্লা নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, অভিযানের সময় তাকে লাঠি ও প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়েছিল।
তার স্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, আকুব্বর বারবার তাকে না মারার অনুরোধ করেছিলেন। পরিবারের দাবি, মারধরের পর তাকে ফেলে রেখে যায় অভিযানকারী দল।
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, আকুব্বর অসুস্থ বোধ করায় তাকে সেখানে রেখে অধিদপ্তরের সদস্যরা স্থান ত্যাগ করেন।
ফলে এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার বক্তব্যের সরাসরি পার্থক্য রয়েছে।
সুন্দরবনে বনরক্ষীর গুলিতে জেলের মৃত্যু
১৮ মে সাতক্ষীরার সুন্দরবনে বন বিভাগের স্মার্ট পেট্রোল টিমের গুলিতে আমিনুর রহমান গাজী নামে এক জেলে নিহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
নিহতের সঙ্গে থাকা জেলেদের দাবি, বন বিভাগের সদস্যরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে আমিনুর গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। তবে বন বিভাগের দাবি, ধস্তাধস্তির সময় তাদের একটি রাইফেল থেকে গুলি বের হয়ে আমিনুরের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবার বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করে। অন্যদিকে বন বিভাগের পক্ষ থেকেও জেলেদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
ডিবি হেফাজতে মৃত্যু
২১ জুন ফরিদপুরের মধুখালীতে ডিবি পুলিশের হেফাজতে মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্তের মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, আটকের পর তাকে মারধর করা হয়েছিল।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ জুন বিকেলে ডিবি পুলিশের একটি দল বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে। এ সময় তার মায়ের সামনেই তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। পরদিন সকালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তবে ডিবি পুলিশের দাবি, ইশতিয়াককে মাদকসহ আটক করা হয়েছিল এবং তাকে কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ডিবি হেফাজতে থাকা অবস্থায় নাশতা করেন এবং পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ইশতিয়াককে পুলিশ সদস্যদের থাপ্পড় দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ভিডিওতে তার দেহ তল্লাশির দৃশ্যও দেখা যায়।
এ ঘটনায় ডিবির ফরিদপুর সদর জোনের তৎকালীন ওসি সৈয়দ মো. আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।
ইশতিয়াকের বিরুদ্ধে করা মাদক মামলার এজাহারের বর্ণনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। প্রকাশিত ভিডিওতে আটকের সময় তার পরনে লুঙ্গি দেখা গেলেও মামলার এজাহারে তার প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা উদ্ধারের কথা বলা হয়। মামলার সাক্ষীদের বক্তব্য নিয়েও গণমাধ্যমে অসঙ্গতির কথা উঠে আসে।
সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের গুলিতে মৃত্যু
২৫ জুন সুন্দরবনের কয়রা এলাকায় কোস্টগার্ডের সঙ্গে কথিত বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র গোলাগুলিতে শওকত সরদার নিহত হন।
কোস্টগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ অভিযানের সময় তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে বনদস্যুরা অতর্কিতে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ড সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজনকে উদ্ধার করা হয়। অভিযানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই রাতে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক গুলির শব্দ শোনা যাওয়ার কথা বলা হয়। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি ছিল, অভিযানের সময় কোস্টগার্ড বনদস্যুদের ঘিরে ফেলে এবং আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। পরে গুলিবিনিময় হয় বলে তাঁদের ভাষ্য। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাঁদপুরে গ্রেপ্তারের পর ইমামের মৃত্যু
৩০ জুলাই চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মিজানুর রহমান নামে এক ইমামকে গ্রেপ্তারের পর তার মৃত্যু হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৬ জুলাই শিশুটিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ পাওয়ার পর মিজানুর রহমানকে ৩০ জুলাই ভোরে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। থানায় নেওয়ার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক জানান, ভোরে পুলিশ তাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকের ধারণা ছিল, তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তবে ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়ার কথা।
অন্যদিকে নিহতের পরিবার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, স্থানীয় বিরোধ ও চাঁদা দাবির সঙ্গে ঘটনাটির যোগসূত্র থাকতে পারে। গ্রেপ্তারের সময় তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠিত না হওয়ায় মানবাধিকার কমিশনের কারও বক্তব্য নেওয়া যায় নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক প্রধান ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের সাথে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে তিনি মন্তব্য করতে চান নি।
উপস্থাপিত তথ্যসমূহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে নেওয়া। ক্রিডোর মূল প্রতিবেদনে সংবাদসূত্র উল্লেখ করা রয়েছে। (এখানে দেখুন )
ক্রিডোর কর্তৃপক্ষের কারও সাথে সরাসরি যোগাযোগ না করা গেলেও জনস্বার্থ ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট হওয়ায় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো।
এমএম/আরএ
সাম্প্রতিক সংবাদ

জুলাইয়ে হামলাকারী বহিষ্কৃত জাবি ছাত্রলীগকর্মী প্রজ্ঞাদ্বীপ এখন ‘আগামীর সময়’র সাংবাদিক

স্বাধীনতার স্থপতি থেকে স্বৈরশাসক, যেভাবে আফ্রিকার ইরিত্রিয়ায় একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন আফওয়ার্কি

১৫০ গ্যাসকূপ: পরিকল্পনা কেবল কাগজেই, বাস্তবে কমছে উৎপাদন

হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, আছে এবং থাকবে; ট্রাম্পের হুমকির জবাবে তেহরান

