Bengal Lens
বিশেষ প্রতিবেদন

১৫০ গ্যাসকূপ: পরিকল্পনা কেবল কাগজেই, বাস্তবে কমছে উৎপাদন

প্রতিবেদক: প্লাবন তারিক

পেট্রোবাংলা ও হাইড্রোকার্বন ইউনিটের প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০১০-১১ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত বেড়েছিল। এরপর কয়েক বছর প্রায় একই পর্যায়ে থাকার পর ২০১৯-২০ থেকে পতনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গত ১৫ বছরে শিখর থেকে প্রায় ২৯ শতাংশ কমেছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন। নতুন কূপে গ্যাস মিললেও পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদনের পতন সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। দেশে গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুরোনো কূপ সংস্কারের একটি বড় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সরকারের দাবি, ইতোমধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপে দৈনিক ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদনক্ষমতা নিশ্চিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১৩৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালনব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। আরও আটটি কূপে কাজ চলমান।

কিন্তু এই অগ্রগতির বিপরীতে দেশের সামগ্রিক গ্যাস উৎপাদনের চিত্রটি উদ্বেগজনক। পেট্রোবাংলা ও হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্য বলছে, এক দশকেরও বেশি সময় আগে যে উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছিল, সেটি এখন দ্রুত নিম্নমুখী। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশীয় ক্ষেত্র থেকে প্রায় ৯৭৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঁচটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত হিসাব যোগ করলে দেশীয় উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ৬৯২ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ শিখরের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ কম। প্রশ্ন তাই শুধু ১৫০টি কূপ খনন হচ্ছে কি না, সেটি নয়। বড় প্রশ্ন হলো—নতুন কূপ থেকে গ্যাস যোগ হওয়ার পরও দেশের মোট উৎপাদন কেন বাড়ছে না?

১৫ বছরের উৎপাদনচিত্র

পেট্রোবাংলা ও হাইড্রোকার্বন ইউনিটের প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০১০-১১ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত বেড়েছিল। এরপর কয়েক বছর প্রায় একই পর্যায়ে থাকার পর ২০১৯-২০ থেকে পতনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

38ff0749-bdd2-49d2-85d2-04cb5f7d8b80

সূত্র: পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদন, হাইড্রোকার্বন ইউনিটের জ্বালানি পরিস্থিতি প্রতিবেদন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক উৎপাদন তথ্য।

এই ধারায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে। ২০১৮-১৯ সালে দেশীয় উৎপাদন ছিল প্রায় ৯৬১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট। পরের অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৮৮২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ এক বছরেই প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন কমে যায়। এরপর সামান্য ওঠানামা হলেও উৎপাদন আর আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।

এখন কারা কত গ্যাস তুলছে

বাংলাদেশে বর্তমানে তিনটি রাষ্ট্রীয় ও দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে গ্যাস উৎপাদনে যুক্ত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস এবং বাপেক্স। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেভরন সবচেয়ে বড় উৎপাদক; অন্যদিকে বাঙ্গুরা ক্ষেত্রের উৎপাদনও বিদেশি পরিচালনায় রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটির উৎপাদনই আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে

এই ধারায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে। ২০১৮-১৯ সালে দেশীয় উৎপাদন ছিল প্রায় ৯৬১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট। পরের অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৮৮২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ এক বছরেই প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন কমে যায়। এরপর সামান্য ওঠানামা হলেও উৎপাদন আর আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।

এখন কারা কত গ্যাস তুলছে

বাংলাদেশে বর্তমানে তিনটি রাষ্ট্রীয় ও দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে গ্যাস উৎপাদনে যুক্ত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস এবং বাপেক্স। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেভরন সবচেয়ে বড় উৎপাদক; অন্যদিকে বাঙ্গুরা ক্ষেত্রের উৎপাদনও বিদেশি পরিচালনায় রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটির উৎপাদনই আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে

121

এই হিসাবে মোট উৎপাদন প্রায় ১৯ হাজার ৫৯৮ মিলিয়ন ঘনমিটার বা প্রায় ৬৯২ বিলিয়ন ঘনফুট। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৫৮ শতাংশই এসেছে শেভরনের পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে। বিপরীতে রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের অংশ ছিল ছয় শতাংশেরও কম। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানির উৎপাদন ৫ হাজার ৮৩৭ মিলিয়ন ঘনমিটার থেকে কমে ৫ হাজার ৩১৪ মিলিয়ন ঘনমিটারে নেমেছে। বাপেক্সের উৎপাদন ১ হাজার ৩৩৪ থেকে কমে ১ হাজার ১৫৫ মিলিয়ন ঘনমিটার হয়েছে। শেভরনের উৎপাদনও ১২ হাজার ৪০৭ থেকে কমে ১১ হাজার ৩৬৮ মিলিয়ন ঘনমিটারে নেমে এসেছে। শুধু সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের উৎপাদন ১ হাজার ৭৩ মিলিয়ন ঘনমিটার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৯২ মিলিয়ন ঘনমিটার হয়েছে। ২০২৬ সালের ৭ জুন বাপেক্সের নিজস্ব তথ্যে প্রতিষ্ঠানটির সব গ্যাসক্ষেত্র মিলিয়ে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১১০ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট।

কূপ আছে, কিন্তু সব কূপে গ্যাস নেই

পেট্রোবাংলার ২০২৩-২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশীয় ও বিদেশি অপারেটর মিলিয়ে মোট ১৫৯টি কূপের মধ্যে ১০৭টি কূপ উৎপাদনে ছিল। তখন তিন রাষ্ট্রীয় কোম্পানির ১০৯টি কূপের মধ্যে উৎপাদনরত ছিল ৬৮টি; এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৮০২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বিদেশি অপারেটরদের ৫০টি কূপের মধ্যে ৩৯টি উৎপাদনে ছিল এবং সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২২১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসছিল। অর্থাৎ কূপের সংখ্যার সঙ্গে উৎপাদনের সরাসরি সম্পর্ক নেই। কোনো একটি বড় ও উচ্চচাপসম্পন্ন কূপের উৎপাদন কয়েকটি ছোট কূপের সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি হতে পারে। একইভাবে একটি প্রতিষ্ঠান বেশি গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করলেও তার উৎপাদন অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম হতে পারে।

বাপেক্সের ক্ষেত্রেই এর উদাহরণ স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে একাধিক গ্যাসক্ষেত্র থাকলেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১০৪ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সময়ে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানির উৎপাদন ছিল প্রায় ৪৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের প্রায় ১৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট।

১৫০ কূপ কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতি কত

সরকারের বর্তমান পরিকল্পনায় ১৫০টি কূপ খনন ও পুরোনো কূপ সংস্কারের কথা বলা হলেও এই কর্মসূচি এক দিনে তৈরি হয়নি। এর আগে পেট্রোবাংলা ২০২৬ সালের মধ্যে অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও পুরোনো কূপ পুনঃউৎপাদনের মাধ্যমে অতিরিক্ত দৈনিক ৮৮১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র থেকে ৬৮১ মিলিয়ন এবং বিদেশি অপারেটরদের ক্ষেত্র থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত উৎপাদনের প্রত্যাশা ছিল।

বর্তমান ১৫০-কূপ কর্মসূচিতে ২৯টির কাজ শেষ হয়েছে। সরকারের হিসাবে এসব কূপে দৈনিক ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদনক্ষমতা নিশ্চিত হলেও বাস্তবে জাতীয় সঞ্চালনব্যবস্থায় প্রাথমিকভাবে যুক্ত হয়েছে দৈনিক ১৩৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট।

এই দুই সংখ্যার পার্থক্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের জায়গা। উৎপাদনক্ষমতা নিশ্চিত হওয়ার পরও প্রায় অর্ধেক গ্যাস কেন জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত হয়নি—তার ব্যাখ্যা দরকার। এর পেছনে কূপের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা, পাইপলাইন, প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা, স্থানীয় চাহিদা কিংবা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—কোনটি কতটা দায়ী, তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

নতুন গ্যাস যোগ হচ্ছে, তারপরও মোট উৎপাদন কমছে কেন

দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অনেকগুলো কয়েক দশক ধরে উৎপাদনে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ স্তরের চাপ ও অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য মজুত কমতে থাকে। ফলে একটি কূপের দৈনিক উৎপাদন সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

পেট্রোবাংলা নিজেও বলছে, স্থানীয় মজুত কমে যাওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। নতুন কূপ থেকে গ্যাস যোগ হলেও পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন পতন অনেক ক্ষেত্রে সেই বাড়তি গ্যাসকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় উৎপাদকের উৎপাদনও কমছে

দেশীয় গ্যাস সরবরাহে শেভরনের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশীয় উৎপাদনের প্রায় ৫৮ শতাংশই এসেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে। ফলে শেভরনের উৎপাদনে সামান্য শতাংশ পতনও জাতীয় হিসাবে বড় ঘাটতি তৈরি করে। ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন আগের বছরের ১২ হাজার ৪০৭ মিলিয়ন ঘনমিটার থেকে ১১ হাজার ৩৬৮ মিলিয়ন ঘনমিটারে নেমেছে।

বাপেক্সের সক্ষমতা ও বিনিয়োগের প্রশ্ন

দেশীয় অনুসন্ধানের মূল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের হাতে বর্তমানে পাঁচটি নিজস্ব খননযন্ত্র রয়েছে। সরকার আরও দুটি নতুন খননযন্ত্র কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার নিজেই বলছে, এগুলো যুক্ত হলে বাপেক্সের খননক্ষমতা বাড়বে এবং কম সময়ে বেশি কূপ খনন করা সম্ভব হবে। বাপেক্সের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, প্রতিষ্ঠানটির কিছু আবিষ্কৃত গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় পাইপলাইন না থাকায় তা জাতীয় সঞ্চালনব্যবস্থায় যুক্ত করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভোলার গ্যাসের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার হলেও মূল ভূখণ্ডে বৃহৎ পরিসরে সরবরাহের অবকাঠামো এখনও সীমিত। এ কারণে উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তব সরবরাহ কম দেখায়।

নতুন কূপের গ্যাস পুরোনো কূপের পতন পূরণ করছে

ধরা যাক, নতুন তিনটি কূপ থেকে দৈনিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ হলো। একই সময়ে পুরোনো বড় ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন দৈনিক ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেল। তাহলে নতুন কূপ সফল হলেও দেশের মোট উৎপাদন বাড়বে না; বরং আরও ২০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই এমন। একটি সময়ের হিসাবে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, জাতীয় সরবরাহে নতুন গ্যাস যুক্ত হলেও বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর পতনের কারণে সামগ্রিক সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। তাই ১৫০-কূপ কর্মসূচি মূল্যায়নে শুধু ‘কতটি কূপ শেষ হয়েছে’, এই সংখ্যা যথেষ্ট নয়। হিসাব হওয়া উচিত, নতুন কূপে কত গ্যাস যোগ হলো এবং এর বিপরীতে পুরোনো কূপে কত উৎপাদন কমল। এর হিসেব অনুযায়ীই বলা যাবে দেশের প্রকৃত উদৎপাদন।

অনুসন্ধানে পিছিয়ে পড়ার মূল্য

হাইড্রোকার্বন ইউনিটের ২০২২-২৩ সালের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর থেকে বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন নিম্নমুখী। একই সময়ে ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি শুরু হয় এবং দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। এর অর্থ এই নয় যে আমদানি করা গ্যাসই দেশীয় উৎপাদন কমিয়েছে। তবে দেশীয় অনুসন্ধান ও নতুন মজুত আবিষ্কারের গতি উৎপাদন পতনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়।

এখন আবার স্থলভাগে অনুসন্ধানের পাশাপাশি সমুদ্রের ২৬টি খণ্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বাপেক্স সাত ও নয় নম্বর খণ্ডে ৪ হাজার ৫০০ রেখা-কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ সম্পন্ন করেছে। তথ্য বিশ্লেষণের পর নতুন কূপের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণের কথা রয়েছে। কিন্তু নতুন অনুসন্ধান থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদে পুরোনো কূপ সংস্কার, চাপ ধরে রাখার প্রযুক্তি, উন্নয়ন কূপ এবং বিদ্যমান আবিষ্কৃত গ্যাসকে সঞ্চালনব্যবস্থায় যুক্ত করাই সবচেয়ে দ্রুত ফল পাওয়ার ক্ষেত্র।

১৫০ কূপের সাফল্য মাপতে যে তথ্য প্রকাশ জরুরি

সরকার যদি এই কর্মসূচিকে প্রকৃতপক্ষে জবাবদিহির আওতায় আনতে চায়, তাহলে ১৫০টি কূপের একটি প্রকাশ্য তালিকা থাকা প্রয়োজন। সেখানে প্রতিটি কূপের নাম, অবস্থান, খননের ধরন, কাজ শুরুর সময়, নির্ধারিত সমাপ্তির সময়, ব্যয়, সম্ভাব্য উৎপাদন এবং বাস্তব উৎপাদন আলাদাভাবে উল্লেখ করা দরকার। বিশেষ করে ইতোমধ্যে সম্পন্ন ২৯টি কূপের ক্ষেত্রে জানতে হবে, কোন কূপ কত গ্যাস দেওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে কত দিচ্ছে এবং কবে থেকে জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে সংশ্লিষ্ট পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন কত কমেছে সেটিও প্রকাশ করতে হবে।তাহলেই বোঝা যাবে ১৫০-কূপ পরিকল্পনা নতুন উৎপাদন বাড়াচ্ছে, নাকি শুধু পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের দ্রুত পতন কিছুটা সামাল দিচ্ছে।

সংখ্যার বাইরে মূল প্রশ্ন

১৫০টি কূপের মধ্যে ২৯টি শেষ হয়েছে এটি নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগতি। কিন্তু কোনো কর্মসূচির সাফল্য কূপের সংখ্যা দিয়ে নয়, শেষ পর্যন্ত জাতীয় উৎপাদন কতটা বাড়ল সেটি দিয়ে বিচার করতে হবে। ২০১৫-১৬ সালে দেশে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ৯৭৩ বিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৪-২৫ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬৯২ বিলিয়ন ঘনফুটে। একই সময়ে নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপ সংস্কার এবং উৎপাদন বাড়ানোর একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তাই এখন সরকারের সামনে প্রশ্ন ১৫০ কূপের মাধ্যমে কত গ্যাস পাওয়া যাবে, সেই সম্ভাব্য হিসাব নয়; পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন পতন বাদ দেওয়ার পর দেশের প্রকৃত উৎপাদন কত বাড়বে? এই হিসাব প্রকাশ না হলে ‘১৫০ গ্যাসকূপ’ বড় একটি প্রকল্পের সংখ্যা হয়েই থাকবে। আর হিসাব প্রকাশ হলে প্রথমবারের মতো বোঝা যাবে বাংলাদেশ আসলে নতুন গ্যাস যোগ করছে, নাকি পুরোনো গ্যাস হারানোর গতিই শুধু কিছুটা কমাচ্ছে।