Bengal Lens
ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন

নিউজ পোর্টালের আড়ালে আওয়ামী বয়ানের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক

প্রতিবেদক: প্লাবন তারিক

তিন সাইটের মধ্যে বিডি পারসপেক্টিভসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য পাওয়া যায় মেটার ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের ‘অ্যাডভারসারিয়াল থ্রেট রিপোর্টে’। মেটা বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত একটি সমন্বিত অসত্য আচরণের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ৫০টি ফেসবুক হিসাব ও ৯৮টি পাতা সরিয়ে দেয়। নেটওয়ার্কটির এক বা একাধিক পাতার মোট অনুসারী ছিল প্রায় ৩৪ লাখ।

বিডি পারসপেক্টিভস, বিডি ভর্টেক্স ও আনটোল্ড বিডি। বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি নিয়ে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করে থাকে তিনটি অনলাইন পোর্টাল।

এগুলোর প্রকাশিত কনটেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আলাদা ওয়েবসাইট হলেও রাজনৈতিক বিষয় নির্বাচন ও উপস্থাপনায় বেশ কিছু মিল রয়েছে। তিন সাইটেই জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রধানত আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে বিভিন্ন লেখায় ব্যর্থ বা বৈধতাসংকটে থাকা প্রশাসন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিএনপিকে সহিংসতা ও শাসনব্যর্থতা এবং জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে ধর্মীয় উগ্রবাদ, পাকিস্তানপন্থা ও ১৯৭১-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতাও রয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি অথবা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা তিন সাইটের বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়।

মেটার অনুসন্ধানে বিডি পারসপেক্টিভস

তিন সাইটের মধ্যে বিডি পারসপেক্টিভসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য পাওয়া যায় মেটার ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের ‘অ্যাডভারসারিয়াল থ্রেট রিপোর্টে’। মেটা বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত একটি সমন্বিত অসত্য আচরণের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ৫০টি ফেসবুক একাউন্ট ও ৯৮টি পেজ সরিয়ে দেয়। নেটওয়ার্কটির এক বা একাধিক পেজেরর মোট অনুসারী ছিল প্রায় ৩৪ লাখ।

মেটা জানিয়েছিল, নেটওয়ার্কের সদস্যরা ভুয়া পরিচয়ের হিসাব ব্যবহার করত এবং কিছু পেজ কাল্পনিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচালিত হতো। এসব ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি ও দলটির নেতাদের নিয়ে নেতিবাচক এবং আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ইতিবাচক কনটেন্ট প্রকাশ করা হতো। মেটার অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগ এবং দলটির গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ওই নেটওয়ার্কের সংযোগ পাওয়া যায়।

bdperspectives

মেটার প্রকাশিত প্রযুক্তিগত সূচকের তালিকায় বিডিপার্সপেক্টিভস ডটকম এর নাম ছিল। ‘বাংলাদেশ পারসপেক্টিভস’ নামে একটি কাল্পনিক সংবাদমাধ্যমের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নেটওয়ার্কটির ফেসবুকের বাইরে ইউটিউব, এক্স, টিকটক, টেলিগ্রাম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটে উপস্থিতি ছিল। তবে ২০২৪ সালের ওই নেটওয়ার্ক এবং বর্তমানে পরিচালিত বিডি পারসপেক্টিভস একই ব্যক্তি বা একই কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে কি না সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিডি পারসপেক্টিভসে নির্বাচন ও সরকার কেন্দ্রিক যে বয়ান রয়েছে

বর্তমান বিডি পারসপেক্টিভসের কনটেন্টে নির্বাচন, অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘিরে একটি ধারাবাহিক সমালোচনামূলক অবস্থান দেখা যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে প্রকাশিত কয়েকটি লেখায় আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে নির্বাচনকে সাজানো প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিছু লেখায়।

পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকারের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়েও একই ধরনের সমালোচনামূলক কনটেন্ট প্রকাশিত হয়েছে। জ্বালানি সংকট নিয়ে একটি লেখায় শেখ হাসিনার সময়ের ব্যবস্থাপনাকে বিএনপির বর্তমান ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগও নিয়মিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর বেশ কয়েকটি লেখা আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে প্রচার করা হয়েছে।

বিডি ভর্টেক্সে শেখ হাসিনা বিরোধীদের বিপরীত উপস্থাপন

বিডি ভর্টেক্সে রাজনৈতিক অবস্থান আরও সরাসরি দেখা যায়। সাইটটির বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্ব ও সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

bdvortex

এর বিপরীতে শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি লেখায় তাঁকে বিদেশি শক্তির কাছে আপস না করা নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এবং চীনা অর্থায়নের প্রকল্পকে তাঁর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়েও বিডি ভর্টেক্সে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এসব লেখার কয়েকটিও আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রচার করা হয়েছে।

আনটোল্ড বিডিতে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সহিংসতা

আনটোল্ড বিডির কনটেন্টে মানবাধিকার, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এ ধরনের বিষয় সাংবাদিকতার স্বাভাবিক ক্ষেত্র। তবে বিভিন্ন ঘটনায় দায় নির্ধারণ ও শিরোনামের ভাষায় একটি রাজনৈতিক প্রবণতা পাওয়া যায়। সাইটটির বিভিন্ন লেখায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক নিপীড়নের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিএনপি সরকারের সময়ের অপরাধ ও সহিংসতাকে শাসনব্যর্থতার সঙ্গে এবং জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাকে ধর্মীয় উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

untoldbd

নারীর প্রতি সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনাও বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আনটোল্ড বিডির লেখাও আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক টেলিগ্রাম চ্যানেলে পাওয়া যায়। নারী প্রার্থীর সংখ্যা, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যানসংক্রান্ত প্রতিবেদন দলীয় বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে।

তিন সাইটের কনটেন্ট সারকুলেশন একই পথে

তিন সাইটের মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান সংযোগ পাওয়া যায় কনটেন্ট বিতরণের ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক টেলিগ্রাম চ্যানেলের প্রকাশিত পোস্টে বিডি পারসপেক্টিভস, বিডি ভর্টেক্স ও আনটোল্ড বিডি তিন সাইটেরই লিংক পাওয়া গেছে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিডি পারসপেক্টিভসের লেখা, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন নিয়ে বিডি ভর্টেক্সের প্রতিবেদন এবং নারী প্রতিনিধিত্ব বা মানবাধিকার নিয়ে আনটোল্ড বিডির কনটেন্ট দলীয় রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে সাইট তিনটি আওয়ামী লীগের মালিকানাধীন। তবে তিনটি আলাদা উৎসে প্রকাশিত একই ধরনের রাজনৈতিক কনটেন্ট একটি দলীয় প্রচারব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

সত্য তথ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

তিনটি সাইটের সব কনটেন্টকে ভুল তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক লেখায় সরকারি পরিসংখ্যান, প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত মতামত ব্যবহার করা হয়েছে। আনটোল্ড বিডিতে নারী নির্যাতন নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সমালোচনামূলক নিবন্ধ বিডি পারসপেক্টিভস ও বিডি ভর্টেক্সে পুনঃপ্রকাশ বা উদ্ধৃত করা হয়েছে। অন্য গণমাধ্যমের সমালোচনামূলক লেখা প্রচার করা নিজে অপপ্রচারের প্রমাণ নয়। তবে কোন তথ্য বেছে নেওয়া হচ্ছে, কোন ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং শিরোনাম ও ব্যাখ্যায় কাকে দায়ী করা হচ্ছে এসব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় অবস্থান তৈরি হতে পারে।

ভুল বা যাচাইহীন দাবির উদাহরণ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে মিয়ানমার ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেছে, যা মিথ্যা। ২০২৫ সালে বিডি ভর্টেক্স দাবি করেছিল, রাখাইন করিডর বিতর্কের জেরে মিয়ানমার বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত মো. মনোয়ার হোসেনকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। এর বিপরীতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব নথিতে দেখা যায়, একই রাষ্ট্রদূতকে ২০ জুন ও ২১ জুলাই ২০২৫ দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। সেপ্টেম্বরেও তিনি মিয়ানমারের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এমনকি ৩ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবেই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেছেন। ফলে ‘অবাঞ্ছিত ঘোষণা’র দাবিটি সরাসরি সরকারি নথির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিডি ভর্টেক্স দাবি করেছিল ‘৮০ শতাংশ মানুষ ইউনূসকে চায় না’। কিন্তু এ নিয়ে কোন জরিপ দেখা যায় নি। ১৩ জুন ২০২৫ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনামেই বলা হয়, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের অবসান চায়। কিন্তু পুরো লেখায় ৮০ শতাংশ সংখ্যাটির উৎস হিসেবে কোনো জনমত জরিপ, নমুনা, জরিপকারী প্রতিষ্ঠান বা গবেষণাপদ্ধতি দেওয়া হয়নি। বরং সম্পাদকীয় বক্তব্য থেকেই সংখ্যাটি ব্যবহার করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয় ‘হোলি আর্টিজানের দণ্ডিত জঙ্গিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে’, যে দাবিটি ছিল মিথ্যা। ৮০ শতাংশের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হোলি আর্টিজান হামলার দণ্ডিত সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আদালতের নথি ও পরবর্তী প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাত দণ্ডিতের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে তাদের আপিল চলছিল এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ছয় দণ্ডিতের আবেদন আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। অর্থাৎ তারা ‘মুক্তি’ পায়নি।

এই সাইটে আরো দেখা যায়, স্টারমার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও মানবাধিকার ইস্যুর কারণে ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেননি, কারণটি প্রমাণহীন। সাইটটি ২০২৫ সালের জুনে ‘ব্রিটিশ সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের’ বরাতে দাবি করে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির কারণেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। কিন্তু নির্দিষ্ট কর্মকর্তা, নথি বা সরকারি বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বিপরীতে ব্রিটিশ সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক সংস্কারে সহযোগিতা করা। যুক্তরাজ্যের সরকারি নথিতে ইউনূস সরকারকে সমর্থনের কথাও রয়েছে। ফলে সাক্ষাৎ না হওয়ার ঘটনাটি সত্য হলেও তার কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ বা মানবাধিকার ইস্যুকে নিশ্চিতভাবে উপস্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এদিকে আনটোল্ড বিডি ওসমান হাদির ওপর হামলার জন্য জামায়াতকে দায়ী করে। কিন্তু প্রকাশের সময় কোনো প্রমাণ ছিল না। শরিফ ওসমান হাদি ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আনটোল্ড বিডি ‘জামায়াতের কৌশল’ হিসেবে হামলাটিকে উপস্থাপন করে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনে জামায়াতকে দায়ী করার পক্ষে কোনো তথ্যসূত্র দেওয়া হয়নি। পরবর্তী পুলিশি তদন্তে একটি নির্দিষ্ট বন্দুকধারীকে শনাক্ত করা হয় এবং মামলার বিবরণে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হয়। পরে তদন্তকারীরা প্রধান সন্দেহভাজনদের ভারতমুখী পালানোর কথাও জানান।

এছাড়া পোর্টালটি জানায় মাইকেল চাকমার ‘গুমের ঘটনা ভুয়া’। যা প্রতিষ্ঠিত অনুসন্ধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আনটোল্ড বিডির একটি লেখায় মাইকেল চাকমার গুমের ঘটনাকে ভুয়া বলে দাবি করা হয় এবং তাঁকে জামায়াতের অর্থায়নে সরকার পতনের সহিংস পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মাইকেল চাকমাকে বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। তাদের অনুসন্ধানে তিনি ৯ এপ্রিল ২০১৯ নিখোঁজ হন এবং পাঁচ বছরের বেশি সময় পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্ত হন। রয়টার্সও তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে পাঁচ বছরের গোপন বন্দিত্বের বিবরণ প্রকাশ

পোর্টালটিতে এনায়েতপুরে ‘১৫ পুলিশকে ঘটনাস্থলেই বিএনপি–জামায়াত হত্যা করেছে’, এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি–জামায়াত ও আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা ১৫ পুলিশকে হত্যা করেছে এবং ১৫ জনই ঘটনাস্থলে নিহত হন। অথচ ঘটনার দিন পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাথমিক তথ্য ছিল এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজন মারা যাওয়ায় মোট সংখ্যা ১৫ হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরবর্তী মামলায় চার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং প্রায় ছয় হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল। ফলে ‘বিএনপি-জামায়াতই দায়ী’, এটিকে তদন্তে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।

এদিকে বিডি পারসপেক্টিভসএ গ্রামীণের আট প্রতিষ্ঠান নিয়ে ঘটনাকে উল্টোভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ। বিডি পারসপেক্টিভসে ‘ইউনূসের ১ কোটি ৫০ লাখ সদস্যের মালিকানাধীন আট প্রতিষ্ঠান জোর করে দখলের পরিকল্পনা’ ধরনের শিরোনামে লেখা প্রকাশের বিষয়টি বাংলাফ্যাক্ট শনাক্ত করেছে। অথচ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটনাটি নিয়ে সমসাময়িক সংবাদে দেখা যায়, অভিযোগটি প্রথম করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর দাবি ছিল গ্রামীণ ব্যাংক আটটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় জোর করে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক পাল্টা দাবি করেছিল, সাত প্রতিষ্ঠানে তাদের পদক্ষেপ আইনসম্মত। অর্থাৎ বিষয়টি ছিল দুই পক্ষের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিরোধ। বিডি পারসপেক্টিভস একটি পক্ষের অবস্থানকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে তুলে ধরে ইউনূসকেই ‘দখলদারির পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

মালিকানা অজানা, কিন্তু বয়ানে মিল

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য দিয়ে বিডি পারসপেক্টিভস, বিডি ভর্টেক্স ও আনটোল্ড বিডিকে একই মালিকানাধীন বা একই কেন্দ্র থেকে পরিচালিত নেটওয়ার্ক বলা যায় না। তবে কয়েকটি তথ্য পাশাপাশি রয়েছে। ২০২৪ সালে মেটা বিডিপার্সপেক্টিভস ডটকমকে আওয়ামী লীগ ও সিআরআই-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সংযোগ পাওয়া একটি সমন্বিত অসত্য আচরণের নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। বর্তমানে তিনটি সাইটের কনটেন্টেই জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ইউনূস, বিএনপি ও জামায়াত নিয়ে ধারাবাহিক সমালোচনামূলক বয়ান পাওয়া যায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক বা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে তিন সাইটের লেখাই আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। তিনটি সাইটের অভিন্ন মালিকানা প্রমাণিত না হলেও তাদের কনটেন্ট একটি একই ধরনের আওয়ামী লীগপন্থী রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছে এবং সেই কনটেন্ট আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক প্রচারব্যবস্থাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।