Bengal Lens
লেন্স এক্সপ্লেইনার

প্রতিবেশীকে শত্রু হিসেবে দেখায়—অর্থমন্ত্রীকে এমন বই উপহার কেন ভারতীয় হাইকমিশনারের?

প্রতিবেদক: প্রকাশ কায়েফ

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তিনি প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ কৌটিল্যের বিখ্যাত গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র-এর একটি অনুলিপি মন্ত্রীকে উপহার দেন । বইটি উপহার দেওয়ার পর থেকেই এর প্রচ্ছদে থাকা কথিত একটি উদ্ধৃতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তিনি প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ কৌটিল্যের বিখ্যাত গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র-এর একটি অনুলিপি মন্ত্রীকে উপহার দেন । বইটি উপহার দেওয়ার পর থেকেই এর প্রচ্ছদে থাকা কথিত একটি উদ্ধৃতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

বিতর্কের সূত্রপাত করে ‘Centrist Nation TV’ একটি পোস্ট। ওই পোস্টে দাবি করা হয়, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে উপহার দেওয়া অর্থশাস্ত্র বইটির প্রচ্ছদে লেখা ছিল—“Every neighboring state is an enemy and the enemy’s enemy is a friend”। যার অর্থ দাঁড়ায়, “প্রত্যেক প্রতিবেশী রাষ্ট্রই শত্রু, আর শত্রুর শত্রু বন্ধু”। পোস্টটির সঙ্গে বইটির একটি প্রচ্ছদের ছবি এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের মন্ত্রীকে বইটি উপহার দেওয়ার ছবি যুক্ত করা হয়।

পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে—ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশ সরকারের একজন মন্ত্রীকে এমন একটি বই কেন উপহার দিলেন, যার প্রচ্ছদে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ‘শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ২০ আগস্ট বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে ভারতীয় হাইকমিশনের ফেসবুক পেজ থেকে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টে হাইকমিশন জানায়, হাইকমিশনার অর্থশাস্ত্র-এর যে অনুলিপিটি উপহার দিয়েছেন, তার প্রচ্ছদে ছিল ভিন্ন একটি উদ্ধৃতি। উদ্ধৃতিটি হলো—“Education is the best friend and an educated person is respected everywhere।” অর্থাৎ, ‘শিক্ষাই সর্বোত্তম বন্ধু এবং একজন শিক্ষিত ব্যক্তি সর্বত্র সম্মানিত।’

হাইকমিশনের পোস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘Every neighboring state is an enemy…’ উদ্ধৃতিসংবলিত প্রচ্ছদের ছবিটিকে ভুয়া তথ্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তারা উপহার দেওয়া বইটির প্রচ্ছদের ছবিও প্রকাশ করে।

তবে এ ব্যাখ্যার পরও বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। ‘Centrist Nation TV’র প্রতিষ্ঠাতা শাফকাত রাব্বি অনিক হাইকমিশনের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে দাবি করেন, তারা যে বইয়ের প্রচ্ছদের ছবি ব্যবহার করেছেন, সেটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস আমাজন থেকে নেওয়া। তার দাবি, ওই সংস্করণের বইয়ের প্রচ্ছদে বিতর্কিত উদ্ধৃতিটি রয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিকভাবে অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটির কিছু সংস্করণে এ ধরনের বিতর্কিত বক্তব্য প্রচ্ছদে উদ্ধৃত করে বইটি বাজারজাত করা হয়েছে।

বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে অ্যামাজনে বিক্রি হওয়া বইটির প্রচ্ছদে “Every neighboring state is an enemy and the enemy’s enemy is a friend” অর্থাৎ, “প্রতিবেশী রাষ্ট্র মাত্রই শত্রু, আর শত্রুর শত্রু বন্ধু” উদ্ধৃতিটি রয়েছে।

বেঙ্গল লেন্সের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভারতীয় হাইকমিশনার যে বইটি অর্থমন্ত্রীকে উপহার দিয়েছেন সেটির প্রচ্ছদে “প্রতিবেশী রাষ্ট্র মাত্রই শত্রু, আর শত্রুর শত্রু বন্ধু” উদ্ধৃতিটি না থাকলেও বইয়ের আলোচনায় এমন কথা রয়েছে।

বিষয়টি যাচাই করতে Academia.edu থেকে অর্থশাস্ত্র গ্রন্থের একটি পিডিএফ সংস্করণ সংগ্রহ করে বইটির ভেতরের বিভিন্ন অংশ পর্যালোচনা করা হয়।

কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে যা যা আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. প্রতিবেশী রাষ্ট্র মাত্রই শত্রু এবং শত্রুর শত্রু বন্ধু: বইটির ষষ্ঠ খণ্ড The Source of Sovereign States এর দ্বিতীয় অধ্যায় Concerning Peace and Exertion এ বলা আছে, রাষ্ট্রের সীমানার সাথে সরাসরি লেগে থাকা রাষ্ট্রটি হলো তাঁর স্বাভাবিক শত্রু। একইভাবে সেই শত্রু রাষ্ট্রের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত রাষ্ট্রটি হলো তাঁর মিত্র বা বন্ধু।

২. শত্রু, মিত্র ও নিরপেক্ষ শাসকসহ প্রশাসনের সবার ওপর গুপ্তচর নিয়োগ: বইটির প্রথম খণ্ড Concerning Discipline এর দ্বাদশ অধ্যায় Institution of Spies: Creation of Wandering Spies এ বলা আছে, শত্রু, মিত্র, মধ্যস্থ, নিম্ন পদমর্যাদার এবং নিরপেক্ষ এই পাঁচ ধরনের রাজা এবং তাদের প্রশাসনের আঠারোটি সরকারি বিভাগের ওপর সর্বদা গুপ্তচরদের সক্রিয় রাখতে হবে।

৩. এলাকার প্রকৃতি অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ছদ্মবেশে গুপ্তচর মোতায়েন: একই খন্ডের একই অধ্যায়ে আরও বলা আছে, নজরদারির জন্য দুর্গের ভেতরে ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে, দুর্গের আশপাশের শহরে সাধু ও সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে এবং গ্রামাঞ্চলে কৃষক ও গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে গুপ্তচর নিযুক্ত করতে হবে।

৪. সীমান্তে ও অরণ্যে নজরদারি ব্যবস্থা: একই খন্ডের একই অধ্যায়ে আরও বলা আছে, শত্রুর গতিবিধি ও অনুপ্রবেশের খবর পাওয়ার জন্য দেশের সীমান্তে রাখালদের, বনাঞ্চলে বনবাসীদের, শ্রমণদের (বৌদ্ধ সন্ন্যাসী) এবং বন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রধানদের গুপ্তচর হিসেবে নিয়োজিত রাখতে হবে।

৫. দ্বিমুখী নজরদারি: বইটির প্রথম খণ্ড Concerning Discipline এর দ্বাদশ অধ্যায় Institution of Spies: Creation of Wandering Spies তে আরও বলা আছে, বিদেশি রাজাদের পাঠানো গুপ্তচরদের স্থানীয় দেশীয় গুপ্তচরদের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। এছাড়া নিজেদের গুপ্তচরদের চরিত্র ও সততা পরীক্ষা করার জন্য একই পেশার বা ছদ্মবেশের অন্য গুপ্তচরকে কাজে লাগাতে হবে।

৬. বিভিন্ন ছদ্মবেশ ও পরিচয়ের আড়ালে তথ্য সংগ্রহ: বইটির প্রথম খণ্ডের একাদশ অধ্যায় The Institution of Spies এবং দ্বাদশ অধ্যায় আরও বলা আছে, গুপ্তচরদের এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বাছাই করতে হবে যারা বিশ্বস্ত, ভালো বংশের এবং বিভিন্ন দেশ ও পেশার উপযোগী ছদ্মবেশ ধারণ করতে অত্যন্ত দক্ষ বা সুপ্রশিক্ষিত। তারা বিভিন্ন পরিচয়ের আড়ালে থেকে দেশের ভেতর ও বাইরের সব গোপন তথ্য সংগ্রহ করবে।