মার্কিন দূতাবাসের সেইফ হাউজে সমন্বয়কদের মগজধোলাই— ফরহাদ মজহারের দাবি কতটা সত্য?

মার্কিন দূতাবাস পরিচালিত ‘সেইফ হাউজে’ রেখে জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের ‘মগজধোলাই’ এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি তুলতে চাপ দেওয়া হয়েছিল -কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারের এমন দাবি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সেই সময় আত্মগোপনে থাকা সমন্বয়কদের একজন রিফাত রশিদ সরাসরি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে আন্দোলনের সময় তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বর্ণনাতেও মার্কিন দূতাবাস পরিচালিত কোনো ‘সেইফ হাউজের’ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একদফা ঘোষণার জন্য কয়েকজন বাংলাদেশি ব্যক্তি সমন্বয়কদের বোঝানো বা চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন -এমন বর্ণনা একাধিক পক্ষের বক্তব্যে পাওয়া যায়।
সম্প্রতি ‘আলাপ’ এর একটি পডকাস্টে ফরহাদ মজহার দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু বিদেশি দূতাবাস আন্দোলনকারীদের জন্য ‘সেইফ হাউজ’ তৈরি বা পরিচালনা করেছিল। তার আরও দাবি, এসব জায়গায় অবস্থানরত সমন্বয়কদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সেখানে তাদের ‘মগজধোলাই’ করা হয়েছিল। সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন।
তবে ফরহাদ মজহারের এই বক্তব্যের পর সেই সময় আত্মগোপনে থাকা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রিফাত রশিদ প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করেছেন। রোববার, ৯ আগস্ট ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে তিনি ফরহাদের দাবিকে মিথ্যা বলে দাবি করেন।
কোথায় ছিলেন রিফাত, হান্নান ও মাহিন
রিফাতের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি, আব্দুল হান্নান মাসউদ ও মাহিন সরকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে প্রথমে বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংস্থার অফিসে এক রাত অবস্থান করেন। ওই আশ্রয়ের যোগাযোগ করে দিয়েছিলেন মুনতাসীর নামে একজন। এরপর তারা আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের এক বন্ধুর বন্ধ থাকা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যান। সেখান থেকে তাদের নেওয়া হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ফাহিম আহমেদ ও আন্দালিব চৌধুরীর বাসায়।
পরবর্তী সময়ে মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন তাদের সেখান থেকে নিয়ে যান। রিফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা পরে তৎকালীন বিএনপি নেতা ওয়াহিদ আলমের ডিওএইচএসের একটি ব্যক্তিগত অফিসে অবস্থান করেন। এই যোগাযোগটি করিয়ে দিয়েছিলেন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। এরপর আরও কয়েকটি ব্যক্তিগত বাসায় রিফাত ও তার সহযাত্রীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন।
জুলকারনাইন সায়েরের প্রকাশিত একটি বিস্তারিত স্মৃতিচারণেও কাছাকাছি বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, ২৯ জুলাই হান্নান, রিফাত, মাহিন এবং আব্দুল গাফফার জিসানের জন্য নিরাপদ জায়গা খোঁজা হচ্ছিল। প্রথমে পরিচিত ব্যক্তিদের বাসা এবং পরে ব্যক্তিগত অফিসকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ওই বর্ণনাতেও এসব স্থানকে মার্কিন দূতাবাসের মালিকানাধীন বা পরিচালিত স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
আব্দুল কাদেরের আশ্রয়ের ব্যবস্থাও ছিল আলাদা
আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের আশ্রয়ের বিষয়ে আন্দোলনের সংগঠক সাদিক কায়েম ২০২৫ সালে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কাদের প্রথমে নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে অবস্থান করছিলেন। পরে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের যোগাযোগের মাধ্যমে তার জন্য নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা করা হয়। সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলকারনাইন সায়েরের সহায়তায় আরও কয়েকজন সমন্বয়কের জন্যও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল।
রিফাত রশিদ অবশ্য তার সাম্প্রতিক পোস্টে আরও নির্দিষ্টভাবে বলেছেন, কাদের প্রথম দিকে ছাত্রশিবিরের ব্যবস্থাপনায় একটি আশ্রয়ে এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাসায় ছিলেন। এটিও রিফাতের নিজস্ব বর্ণনা; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবার পৃথক বক্তব্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
প্রকাশ্য সূত্রে রিফাত, হান্নান, মাহিন, আব্দুল গাফফার ও আব্দুল কাদেরের আত্মগোপন ও আশ্রয়ের বিষয়ে তুলনামূলক বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলেও হাসিব আল ইসলামের ক্ষেত্রে ‘সেইফ হাউজ’ নেটওয়ার্কে থাকার বিষয়টি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দূতাবাসের ভূমিকার দাবি কতটা সত্য?
মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, আন্দোলনের সময় সমন্বয়কদের জীবনরক্ষার প্রয়োজন ছিল এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন দূতাবাসের মানবাধিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, দূতাবাসগুলো সাড়া দেয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস সমন্বয়কদের কোনো ‘সেইফ হাউজে’ রাখেনি। তারা সাধারণ মানুষের বাড়িঘরেই অবস্থান করেছিলেন। তিনি ফরহাদ মজহারের বক্তব্যে ‘তথ্যগত বিভ্রাট ও অসংগতি’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
তবে ওই সময় মার্কিন দূতাবাস পুরোপুরি জনবলশূন্য ছিল, এমন দাবিও তথ্যসমর্থিত নয়। মার্কিন সরকারের ২০ জুলাইয়ের ভ্রমণ সতর্কতায় নন-ইমারজেন্সি কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে পিটার হাস ২২ জুলাই রাষ্ট্রদূত হিসেবে শেষ কর্মদিবস পালন করেন। তার পর ডেপুটি চিফ অব মিশন হেলেন লাফেভ Chargé d’Affaires হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২২ জুলাই কারফিউর কারণে দূতাবাস বন্ধ ছিল।
তাহলে ‘চাপ’ দেওয়ার অভিযোগ কি পুরোপুরি মিথ্যা?
রিফাত রশিদ নিজেই বলেছেন, তাদের আশ্রয়দাতারা সাধারণত কোনো পরামর্শ দিতে আসেননি। তবে ২ আগস্ট রাতে একদফার বিষয়ে তাদের পরামর্শ দিতে কেউ কেউ এসেছিলেন এবং তারা সেই পরামর্শ গ্রহণ করেননি। রিফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, একদফা ঘোষণার ভাষা নিয়ে তিনি সেই রাতেই ফরহাদ মজহারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং তার কিছু পরামর্শ নোট করেন।
জুলকারনাইন সায়েরের আগের একটি দীর্ঘ স্মৃতিচারণে দেখা যায়, ২ আগস্ট কিছু বাংলাদেশি ব্যক্তি ও আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কয়েকজন সমন্বয়কদের দ্রুত একদফার দাবিতে যাওয়ার জন্য জোরালোভাবে উৎসাহিত করছিলেন। তার বর্ণনায় কাদের, হান্নান, রিফাত ও মাহিনের সঙ্গে এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষির কথাও রয়েছে। তবে সায়ের একই সঙ্গে দাবি করেছেন, তাদের জবরদস্তি করা হয়নি।
সামাজিকমাধ্যমে ফরহাদকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া
ফরহাদ মজহারের বক্তব্যের পর সবচেয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া এসেছে রিফাত রশিদের কাছ থেকেই। তিনি লিখেছেন, ফরহাদ চাইলে তাদের একটি ফোন করেই পুরো বিষয়টি যাচাই করতে পারতেন। মার্কিন ষড়যন্ত্রের বয়ান তৈরির সমালোচনা করলেও ফরহাদের চিন্তা ও রাজনৈতিক ভূমিকার প্রতি নিজের সম্মানও তিনি অস্বীকার করেননি। বরং রিফাত বলেছেন, ফরহাদের ‘ভাববৈঠকী’র পরিচিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তাদের সঙ্গে কিছু নাগরিক ও মানবাধিকারকর্মীর যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল।
সামাজিক মাধ্যমে নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসানও ফরহাদের বক্তব্যকে ‘অর্ধসত্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, ফরহাদ দুটি আলাদা ঘটনাকে এক করে ফেলেছেন। একদিকে সমন্বয়কদের নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা, অন্যদিকে তাদের ওপর একদফা ঘোষণার জন্য কিছু বাংলাদেশির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছিল। তিনি আরও দাবি করেন, তিন সমন্বয়ক একটি দূতাবাসের কাছে আশ্রয় চাইলেও তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং পরবর্তী আশ্রয়গুলো ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত হয়েছিল।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও ফরহাদের বক্তব্যকে সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন। রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এনপিএর বাকী বিল্লাহও বলেছেন, সমন্বয়কদের মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে সরকার পতনে প্রভাবিত করার দাবির ভিত্তি তিনি দেখেন না।
বিতর্কের পর ফরহাদ মজহার অবশ্য মার্কিন ‘সেইফ হাউজে’ আন্দোলনকারীদের আশ্রয়ের দাবি থেকে সরে আসেননি। তবে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি পডকাস্টে ‘সরকার পতনের কথা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে’। এমন বক্তব্য দেওয়ার ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি তোলেন এবং গণমাধ্যম তার বক্তব্যকে বিকৃত করছে বলেও অভিযোগ করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন আব্দুল গাফফার। যিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সমন্বয়কদের সাথে সেইফ হাউজে ছিলেন। এ বিষয়ে আব্দুল গাফফারের সঙ্গে কথা হয় বেঙ্গল লেন্সের। তিনি বলেন, সেইফ হাউজে রেখে সমন্বয়কদের ‘মগজধোলাই’ এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি জানাতে চাপ দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। আমার মতে মার্কিন দূতাবাস কেবল আমাদের নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতা করেছিল। এছাড়া সেইফ হাউজ বলতেও আসলে কিছুই ছিল না। মূলত দূতাবাস, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী- সবার সমন্বনিত একটি চেষ্টা ছিল সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই যাকে যেখানে রাখার ব্যবস্থা করা গেছে, এটাই মূলত উনারা করেছেন। এর বাইরে আর কিছু না। তাছাড়া আমরা মার্কিন দূতাবাসে ছিলাম না। ২৬ জুলাই একবার থাকার পরিকল্পনা হলেও, পরে আমরা বনানীতে ছিলাম। এটাও যে ফিক্সড জায়গা ছিল, এমন না। আমরা একেকসময় একেক জায়গায় ছিলাম।
ফরহাদ মহজারের দাবির প্রসঙ্গে আব্দুল গাফফার বলেন, হাসিনার পদত্যাগের দাবি করার জন্য আমাদেরকে চাপ দিতে হবে কেন? আমরা তো সবাই এমনিতেই চাচ্ছিলাম তার পতন হোক। পারলে সেটা ৩০ জুলাইয়ের মধ্যেই করতাম আমরা। আর সমন্বয়কদের মগজধোলাই করারই বা কি আছে। তারা তো আন্দোলনকে চালিয়ে নিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মাঠে নেমেছিল। সেই হিসেবে উনার এই দাবিটা বাড়াবাড়িই বলা যায়।
সাম্প্রতিক সংবাদ

জামায়াত ও আ.লীগ নিয়ে তারেক রহমানের ‘কথোপকথন’: অডিওটি এআই নির্মিত

ফের ভুয়া ফটোকার্ড পোস্ট করে গুজব ছড়ালেন সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা

৯ বছরের আগের ভিডিও ছড়িয়ে 'হাসিনা মারা যায়নি' দাবি আওয়ামীপন্থীদের

ফ্যাক্ট-চেকের নামে বিভ্রান্তি, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল

