Bengal Lens
বাংলাদেশ লেন্স

আইআরআইয়ের জরিপ

জুলাই চার্টার সম্পর্কে এখনো জানে না দেশের ৫৯ শতাংশ মানুষ

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রদর্শন করছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রদর্শন করছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

আই আর আইয়ের জাতীয় জরিপে ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, জুলাই জাতীয় চার্টারের নাম শুনলেও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছু জানেন না অথবা চার্টারটির নামই শোনেননি। চার্টারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানেন এমন মানুষের বড় অংশ আবার মনে করেন, এর সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার খুব ধীরে এগোচ্ছে। বিপরীতে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু মনে করছেন প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ। সরকারের সামগ্রিক কাজেও ইতিবাচক মূল্যায়ন নেতিবাচকের চেয়ে এগিয়ে।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা একটি রূপরেখা হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরের মাধ্যমে সনদটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিলেও এর বিষয়বস্তু এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) ২০২৬ সালের জাতীয় জনমত জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মাত্র ৭ শতাংশ বলেছেন, জুলাই জাতীয় চার্টারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তারা খুব ভালোভাবে পরিচিত। আরও ২৪ শতাংশ এর কিছু বিষয়বস্তু জানেন। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে চার্টারের অন্তত কিছু বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা আছে ৩১ শতাংশ মানুষের। অন্যদিকে ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা জুলাই চার্টারের নাম শুনেছেন, কিন্তু এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আরও ১৯ শতাংশ চার্টারটির নামই শোনেননি। এই দুই শ্রেণি মিলিয়ে ৫৯ শতাংশ মানুষ চার্টারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কার্যত কিছু জানেন না। আরও ১০ শতাংশ এ প্রশ্নে কোনো মত দেননি বা উত্তর দিতে চাননি।

এই জরিপটি ১৬ মে থেকে ২৪ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার আট বিভাগের ৫ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর পরিচালিত হয়। নমুনাটি জাতীয় পর্যায়ে ভোটার বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে বলে আইআরআই জানিয়েছে। জরিপটির পূর্ণ নমুনায় ত্রুটির সীমা ৯৫ শতাংশ আস্থাস্তরে প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট।

নারীদের মধ্যে জুলাই চার্টার সম্পর্কে জানাশোনা আরও কম

জুলাই চার্টার সম্পর্কে জানাশোনায় নারী-পুরুষের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। পুরুষদের ৯ শতাংশ চার্টারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে খুব পরিচিত এবং ২৮ শতাংশ কিছু বিষয় জানেন। অর্থাৎ পুরুষদের মধ্যে মোট ৩৭ শতাংশের চার্টার সম্পর্কে অন্তত কিছু ধারণা রয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৫ শতাংশ যার ৫ শতাংশ খুব পরিচিত এবং ২০ শতাংশ কিছু বিষয়বস্তু জানেন। বিপরীতে নারীদের ২৭ শতাংশ চার্টারের নামই শোনেননি, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ।

শিক্ষার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে চার্টার সম্পর্কে জানাশোনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ১৬ শতাংশ খুব পরিচিত এবং ৩৪ শতাংশ কিছু বিষয়বস্তু জানেন। অর্থাৎ অর্ধেকেরই অন্তত কিছু ধারণা রয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক বা তার কম শিক্ষিতদের মধ্যে এ হার মাত্র ২৪ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের অবস্থাও তুলনামূলক ভালো। তাদের ১৩ শতাংশ চার্টারের বিষয়ে খুব পরিচিত এবং ২৯ শতাংশ কিছু বিষয় জানেন; সম্মিলিতভাবে ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থীর চার্টার সম্পর্কে অন্তত কিছু ধারণা রয়েছে। এই তথ্য ইঙ্গিত করে, জুলাই চার্টারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও নীতিগত আলোচনা চললেও তা এখনো বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর জন্য যথেষ্ট সহজবোধ্য বা দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। যারা চার্টার জানেন, তাদের ৫৯ শতাংশের মতে সরকার ধীরে এগোচ্ছে।

চার্টার সম্পর্কে জানাশোনার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি এর বাস্তবায়নের গতি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। চার্টারের কিছু বিষয়বস্তু জানেন বা এর সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত এমন ১ হাজার ৫৫৩ জনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জুলাই জাতীয় চার্টারের সংস্কার বাস্তবায়নে নতুন সরকার কী গতিতে এগোচ্ছে। তাদের মধ্যে ৫৯ শতাংশের মত, সরকার খুব ধীরে এগোচ্ছে। মাত্র ২৮ শতাংশ মনে করেন সরকার সঠিক গতিতে এগোচ্ছে। ৮ শতাংশের মতে সরকার প্রয়োজনের তুলনায় খুব দ্রুত এগোচ্ছে।

তরুণদের মধ্যে দ্রুত সংস্কারের প্রত্যাশা আরও বেশি। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী চার্টার-সচেতন উত্তরদাতাদের ৬৬ শতাংশ মনে করেন সরকার খুব ধীরে এগোচ্ছে। ২৬-৩৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এ হার ৫৬ শতাংশ, ৩৬-৫৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৮ এবং ৫৬ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ। ফলে জরিপের দুটি ফল পাশাপাশি রাখলে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। অধিকাংশ মানুষ চার্টার সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। কিন্তু যারা জানেন, তাদের বড় অংশ এর বাস্তবায়নে আরও গতি চান।

ধীরগতির অভিযোগ থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদী ৫৬ শতাংশ তবে সংস্কার বাস্তবায়নের গতি নিয়ে অসন্তোষ মানেই যে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আশা নেই, জরিপ তা বলছে না। চার্টার সম্পর্কে জানেন এমন উত্তরদাতাদের ১৯ শতাংশ খুব আশাবাদী যে নতুন সরকার চার্টারের সংস্কারগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে। আরও ৩৭ শতাংশ কিছুটা আশাবাদী। অর্থাৎ মোট ৫৬ শতাংশ আশাবাদী। অন্যদিকে ৩৩ শতাংশ কিছুটা এবং ৮ শতাংশ খুবই হতাশাবাদী মোট ৪১ শতাংশ। শহুরে উত্তরদাতাদের মধ্যে বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদী ৬২ শতাংশ। যেদিকে গ্রামে এই হার ৫৪ শতাংশ। এতে দেখা যায়, চার্টারকে জানেন এমন মানুষের মধ্যে সংস্কারের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা এখনো আছে, কিন্তু তারা বাস্তবায়নের বর্তমান গতিতে সন্তুষ্ট নন।

চার্টারের নাম নয়, সংস্কারধর্মী ইস্যুতে মানুষের আগ্রহ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জুলাই চার্টারের বিষয়ে মানুষের জানাশোনা কম হলেও নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের প্রশ্নে তারা দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কারকে সামনে রাখছেন। নতুন সরকারের প্রথম ও দ্বিতীয় অগ্রাধিকার একসঙ্গে হিসাব করলে সবচেয়ে বেশি ৩৩ শতাংশ মানুষ দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা বলেছেন। এরপর ২২ শতাংশ আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং ২১ শতাংশ শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেছেন ২০ শতাংশ, অর্থনৈতিক সংস্কার ১৭ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি স্থিতিশীল করা ১৫ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান তৈরির কথা ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা উল্লেখ করেছেন। এখানেই জরিপটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। ‘জুলাই চার্টার’ নামটি মানুষের কাছে যথেষ্ট পরিচিত না হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা, দুর্নীতি, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে মানুষের স্পষ্ট প্রত্যাশা রয়েছে। ফলে সংস্কার প্রশ্নে জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি যতটা না মানুষের আগ্রহের অভাব, তার চেয়ে বেশি চার্টারের বিষয়বস্তু সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ঘাটতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

জুলাই জাতীয় সনদ

নির্বাচন নিয়ে মানুষের ইতিবাচক ধারণা বেশি

জুলাই চার্টারের তুলনায় নির্বাচন নিয়ে জনমত অনেক বেশি সুস্পষ্ট। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনকে ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবাধ ও সুষ্ঠু’ এবং আরও ৩৫ শতাংশ ‘কিছুটা অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলেছেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ৭৩ শতাংশ মানুষ নির্বাচনটিকে অন্তত মোটামুটি অবাধ ও সুষ্ঠু বলে মনে করছেন। বিপরীতে ১৭ শতাংশ নির্বাচনকে কিছুটা কারচুপিপূর্ণ এবং ৫ শতাংশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কারচুপিপূর্ণ বলেছেন। অর্থাৎ নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক মূল্যায়ন মোট ২২ শতাংশ। ভবিষ্যতের নির্বাচন নিয়েও আস্থা তুলনামূলক শক্তিশালী। ৪১ শতাংশ খুব আশাবাদী এবং ৩৬ শতাংশ কিছুটা আশাবাদী যে ভবিষ্যতের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। সব মিলিয়ে ৭৭ শতাংশ মানুষ ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী। বিপরীতে ১৯ শতাংশ হতাশাবাদী।

এখানে নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই চার্টারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধানও ধরা পড়ে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে কি না এ বিষয়ে অধিকাংশ মানুষের স্পষ্ট অবস্থান আছে; কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক দলিল জুলাই চার্টারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে মাত্র তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন জানেন।

নির্বাচন কমিশনের কাজেও ইতিবাচক মূল্যায়ন

প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নেও নির্বাচন কমিশন ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। জরিপে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে ১৮ শতাংশ দৃঢ়ভাবে এবং ৩৫ শতাংশ কিছুটা অনুমোদন দিয়েছেন। অর্থাৎ মোট অনুমোদন ৫৩ শতাংশ। বিপরীতে ৩৮ শতাংশ অসন্তুষ্ট। নির্বাচন কমিশনের ‘নেট অ্যাপ্রুভাল’ দাঁড়িয়েছে +১৫ শতাংশ পয়েন্টে। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক দল দেখতে চান ৪৯ শতাংশ মানুষ; বর্তমান রাজনৈতিক বিকল্পেই সন্তুষ্ট ৪৩ শতাংশ।

সরকারের কাজে সন্তুষ্ট ৫৫ শতাংশ

জরিপে নতুন সরকারের সামগ্রিক কাজের মূল্যায়নেও ইতিবাচক মত এগিয়ে রয়েছে। ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন সরকার ‘খুব ভালো’ কাজ করছে এবং আরও ২৯ শতাংশের মতে ‘মোটামুটি ভালো’ কাজ করছে। অর্থাৎ মোট ৫৫ শতাংশ সরকারের কাজে ইতিবাচক মূল্যায়ন দিয়েছেন। বিপরীতে ২৬ শতাংশ সরকারের কাজকে ‘কিছুটা খারাপ’ এবং ১৫ শতাংশ ‘খুব খারাপ’ বলেছেন। মোট নেতিবাচক মূল্যায়ন ৪১ শতাংশ। ৫ শতাংশ কোনো মত দেননি। প্রশ্নটি গোপন ব্যালট পদ্ধতিতে করা হয়েছিল।

তবে দেশের সামগ্রিক গতিপথ নিয়ে মূল্যায়ন আরও কাছাকাছি। ৪৬ শতাংশ মনে করেন বাংলাদেশ সঠিক দিকে এগোচ্ছে, ৪৪ শতাংশ মনে করেন ভুল দিকে যাচ্ছে এবং ৯ শতাংশ কোনো মত দেননি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একই ধরনের জরিপে ৫৩ শতাংশ মানুষ দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে বলে মনে করেছিলেন। ২০২৬ সালের জুনে তা ৪৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ সরকারের কাজের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠের ইতিবাচক মূল্যায়ন থাকলেও দেশের সামগ্রিক গতিপথ নিয়ে জনমত এখন প্রায় সমান দুই ভাগে বিভক্ত।

বিএনপি

যারা দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে মনে করেন, তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশ উন্নত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ১৭ শতাংশ আইনশৃঙ্খলার উন্নতিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ভুল পথে যাচ্ছে মনে করা ব্যক্তিদের প্রধান অভিযোগ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ১৮ শতাংশ; এরপর আইনশৃঙ্খলা ও বিচার পরিস্থিতির অবনতি ১৭ শতাংশ এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি ১০ শতাংশ।

মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক সমস্যা কী এমন খোলা প্রশ্নে ২২ শতাংশ দুর্নীতিকে সামনে এনেছেন। মাদক ১৫ শতাংশ, অপরাধ-সন্ত্রাস-নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ১২ শতাংশ, দ্রব্যমূল্য ১০ শতাংশ এবং বেকারত্ব ৯ শতাংশের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। নির্বাচন, নির্বাচনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক দল সংস্কারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ৪ শতাংশ।

12

এখানেও জুলাই চার্টার প্রসঙ্গে একটি তাৎপর্যপূর্ণ চিত্র তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক দলিলের নাম বা বিস্তারিতের চেয়ে তাদের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দুর্নীতি, বিচার, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে চার্টারকে জনপরিসরে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এর সংস্কার প্রস্তাবগুলো মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও প্রত্যাশার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত সেটি তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয় জরিপটি।

সংবাদে এখনো টেলিভিশনের আধিপত্য

মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রেও জরিপে স্পষ্ট ব্যবধান দেখা গেছে। সংবাদ পাওয়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ৫৯ শতাংশ মানুষ টেলিভিশনের কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ১৯ শতাংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে অন্যান্য ইন্টারনেট উৎস ১২ শতাংশ। সংবাদপত্রকে প্রধান সংবাদমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন মাত্র ৪ শতাংশ এবং রেডিও ১ শতাংশ।

রাজনৈতিক সংবাদ ও তথ্যের সবচেয়ে বিশ্বস্ত নির্দিষ্ট উৎস হিসেবে ১৫ শতাংশ সময় টিভি, ১২ শতাংশ যমুনা টিভি, ৮ শতাংশ এনটিভি এবং ৭ শতাংশ আরটিভির নাম বলেছেন। ফেসবুককে সবচেয়ে বিশ্বস্ত উৎস বলেছেন ৫ শতাংশ এবং ইউটিউবকে ২ শতাংশ। মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমেও মোট ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা অনুমোদন জানিয়েছেন ১৯ শতাংশ দৃঢ়ভাবে এবং ৪০ শতাংশ কিছুটা। বিপরীতে ৩৭ শতাংশ অসন্তুষ্ট।

জনসমর্থনের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনসম্পৃক্ততা

আইআরআইয়ের জরিপের সামগ্রিক ফল বলছে, নির্বাচন ও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে জনমতে একটি পরিমিত ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ৭৩ শতাংশ অন্তত মোটামুটি অবাধ ও সুষ্ঠু মনে করেন। ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী ৭৭ শতাংশ। সরকারের কাজ ভালো বলছেন ৫৫ শতাংশ। কিন্তু জুলাই জাতীয় চার্টারের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে অন্তত কিছু জানেন, আর ৫৯ শতাংশ হয় শুধু নাম শুনেছেন কিন্তু কিছু জানেন না, নয়তো নামই শোনেননি।

অর্থাৎ রাষ্ট্র সংস্কারের যে দলিলটি রাজনৈতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি এখনো বৃহত্তর জনপরিসরে সমানভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। একই সময়ে যারা চার্টার সম্পর্কে জানেন, তাদের ৫৯ শতাংশই বাস্তবায়নের গতি ধীর মনে করছেন। আবার ৫৬ শতাংশ বিশ্বাস করেন শেষ পর্যন্ত সরকার এই সংস্কার সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে।

এই তিনটি সংখ্যা ৩১ শতাংশের জানাশোনা, ৫৯ শতাংশের ধীরগতির অভিযোগ এবং ৫৬ শতাংশের বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদ জুলাই চার্টারের সামনে থাকা প্রধান রাজনৈতিক ও যোগাযোগগত চ্যালেঞ্জকেই তুলে ধরে। জনমত সংস্কারের বিপক্ষে জরিপ এমনটি বলছে না; বরং চার্টারটি মানুষের কাছে কতটা পৌঁছেছে এবং মানুষ যে দ্রুত পরিবর্তন প্রত্যাশা করছেন, তার সঙ্গে বাস্তবায়নের গতি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সেই প্রশ্নকেই সামনে আনছে।

উল্লেখ্য যে, ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট একটি যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নাগরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে কাজ করে। সংস্থাটি বিভিন্ন দেশে জনমত জরিপ, রাজনৈতিক ও সামাজিক গবেষণা এবং নাগরিকদের মতামত বিশ্লেষণ করে নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে সহায়তা করে। সংস্থাটি এখন পর্যন্ত ১০০টির বেশি দেশে ১,২০০টিরও বেশি জনমত জরিপ পরিচালনা করেছে এবং ১৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত সংগ্রহ করেছে।

বাংলাদেশেও সংস্থাটি নিয়মিত জাতীয় জনমত জরিপ পরিচালনা করে, যেখানে নির্বাচন, রাজনৈতিক দল, গণতন্ত্র, সরকারের কার্যক্রম, সংস্কার, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও গণমাধ্যম সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিমাপ করা হয়। ২০২৬ সালের জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ৫ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।