নতুন গুম আইন নিয়ে বিতর্ক কেন?

গুম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তি, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন এবং দ্রুত বিচারের সুযোগ। সব মিলিয়ে নতুন আইনটি গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য আশার বার্তা হয়ে আসার কথা। কিন্তু ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদনের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এর কেন্দ্রে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিসের একটি ফেসবুক পোস্ট।
গত ৪ আগস্ট নাবিলা ইদ্রিস তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, নতুন আইনে পরিবারের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা গুমের অভিযোগ করা হলে অভিযোগকারী নিজেই শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের বিধান প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ প্রমাণ সংগ্রহ করা অনেক সময় কঠিন। বিশেষ করে অভিযুক্ত হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নাম এলে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার পরিস্থিতিকে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ হিসেবে দেখার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
নাবিলার পোস্টের পর প্রশ্ন উঠেছে, বছরের পর বছর স্বজনের সন্ধানে থাকা পরিবারগুলোর ওপর কি অভিযোগের প্রমাণ দেওয়ার বাড়তি দায় চাপানো হচ্ছে? অন্যদিকে, মিথ্যা অভিযোগ ঠেকাতে আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন কেউ কেউ। তবে এই বিশেষ বিধানটি আইনের সরকারি সারসংক্ষেপে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এটিকে চূড়ান্ত আইনের নিশ্চিত ধারা হিসেবে নয়, বরং নাবিলা ইদ্রিসের উত্থাপিত দাবি ও উদ্বেগ হিসেবে দেখা উচিত।
নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে যা আছে
মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ গুমকে সাধারণ অপহরণ বা আটকের পরিবর্তে আলাদা ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিচার করা হবে।
গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের কারণে কারও মৃত্যু হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর পরও তাঁকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা না গেলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
আইনের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক ক্ষতিপূরণ। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ভুক্তভোগী বা তাঁর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে। পাশাপাশি সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিলের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত এবং পরবর্তী ১২০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণ, সাক্ষী ও অভিযোগকারীর গোপনীয়তা এবং তথ্য প্রকাশকারীর নিরাপত্তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না মিললে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য ‘গুম সনদ’ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গঠন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়ার প্রস্তাব। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশে গুমের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন খসড়ায় সেই দায়িত্ব পুলিশের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ না করলে ভুক্তভোগীর পক্ষে যে কেউ এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করতে পারবেন।
এখানেই বড় প্রশ্ন উঠেছে। অতীতে বহু গুমের অভিযোগে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নাম এসেছে। সে ক্ষেত্রে একই কাঠামোর একটি সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দিলে তদন্ত কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াও সমালোচনার মুখে পড়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৭ জুলাই সর্বসাধারণের মতামতের জন্য খসড়াটি প্রকাশ করে এবং ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে মতামত দিতে বলে। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ এই মানবাধিকার আইন নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য কার্যত মাত্র এক দিন সময় দেওয়া হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এই সময়সীমাকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় দেওয়ার দাবি জানায়। সংস্থাটি ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানায়। তবে সময় বাড়ানোর আগেই মন্ত্রিসভা খসড়াটির নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
এ বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই রাখা হয়েছে। অথচ অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের সদস্য বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে উঠতে পারে। ফলে তদন্তে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের কাছে আসা প্রায় ১,৫০০ অভিযোগের মধ্যে ২৫০টিরও কম ঘটনা সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) নথিভুক্ত হয়েছিল। পাশাপাশি সামরিক, গোয়েন্দা বা আধাসামরিক বাহিনীর কাছ থেকে নথি সংগ্রহ, সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির করা বা সংরক্ষিত স্থাপনায় প্রবেশের মতো ক্ষমতা সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তার নেই, যা কার্যকর তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এর প্রভাব শুধু অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয় বলেও ম্নতব্য করেছেন ড. নাবিলা। তিনি বলেন, আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গুমের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেতে তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রয়োজন। সেই স্বীকৃতি না পেলে পরিবার ‘গুম সনদ’ পাবে না, নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বা পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার বণ্টনের মতো আইনগত অধিকারও প্রয়োগ করতে পারবে না। ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও দণ্ডাদেশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কার্যকর তদন্ত না হলে বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি স্বীকৃতি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এ কারণে তদন্তের দায়িত্ব অভিযুক্ত হতে পারে এমন সব বাহিনীর কমান্ড কাঠামোর বাইরে থাকা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার হাতে দেওয়াই আইনটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষারও এই আইন নিয়ে তার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
বেঙ্গল লেন্সকে তিনি বলেন, সরকারের মধ্যে গুমের স্বীকার এত ব্যক্তি থাকার পরও সরকার কেন এমন আইন করতে যাচ্ছে তা জানি না। গুমের অভিযোগের তদন্তভার পুলিশকে দিলে ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবার হয়রানির শিকার থেকে কারাগারে পর্যন্ত যেতে হতে পারে। এর সবচেয়ে বড় দিক হলো, মানুষের মধ্যে গুমের ভীতি কাজ করবে। এ নিয়ে অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে পাশ হওয়া অধ্যাদেশটিই আইন হলে যথার্থ হতো।
এমএম/আরএ
সাম্প্রতিক সংবাদ

জামায়াত ও আ.লীগ নিয়ে তারেক রহমানের ‘কথোপকথন’: অডিওটি এআই নির্মিত

ফের ভুয়া ফটোকার্ড পোস্ট করে গুজব ছড়ালেন সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা

৯ বছরের আগের ভিডিও ছড়িয়ে 'হাসিনা মারা যায়নি' দাবি আওয়ামীপন্থীদের

ফ্যাক্ট-চেকের নামে বিভ্রান্তি, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল

