Bengal Lens
বাংলাদেশ লেন্স

বাংলাদেশ নিয়ে ভারত সরকারের ‘ডাবল গেইম’

স্বৈরাচার হাসিনা ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর তার ছবিতে জনগনের ক্ষোভ।
স্বৈরাচার হাসিনা ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর তার ছবিতে জনগনের ক্ষোভ। | লুইস টাটো/এএফপি/গেটি ইমেজেস

একদিকে শেখ হাসিনার নয়াদিল্লির অনুষ্ঠান থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ দূরে রাখার দাবি ভারতের। অন্যদিকে সেই অনুষ্ঠানের আয়োজক এফসিসির সভাপতি বলছেন, আয়োজনটি নিয়ে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না। আরও বলছেন, বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে দুবার আমন্ত্রণ জানানোর পরই শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন তিনি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সভাপতিকে ভারতের মাটিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং একই সময়ে দিল্লির সরকারি অস্বীকৃতি, দুই অবস্থান ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত কি প্রকাশ্যে এক নীতি আর বাস্তবে আরেক নীতি অনুসরণ করছে?

ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের নয়াদিল্লির বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই এমন অবস্থান স্পষ্ট করেছিল নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য ছিল, অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছে একটি বেসরকারি গণমাধ্যম সংগঠন। ভারত সরকার এর সঙ্গে যুক্ত নয় এবং সেখানে প্রকাশিত বক্তব্যও ভারত সরকারের অবস্থান নয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চাওয়ার পর ৪ আগস্ট এই অবস্থান জানায় দিল্লি।

কিন্তু এর এক দিন আগে, গত ৩ আগস্ট, অনুষ্ঠানটির আয়োজক দক্ষিণ এশিয়ার বিদেশি সংবাদদাতাদের ক্লাবের সভাপতি ড. ওয়ায়েল আওয়াদ ডেইলি ওয়াদাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যে বক্তব্য দেন, সেটি পুরো ঘটনাটিকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ভারতের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে কি না এমন প্রশ্নে আওয়াদ বলেন, তিনি মনে করেন না এটি কোনো সমস্যা তৈরি করবে। তাঁর যুক্তি, এফসিসি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়ে তারা কোনো পক্ষ নেয় না।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আওয়াদ জানান বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তিনি এফসিসিতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার জন্য দুবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ১৯ জানুয়ারি থেকেই তিনি এই চেষ্টা করছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানোরও আগে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি আসেননি। এই বক্তব্যের মধ্যেই যেন নয়াদিল্লির ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র লুকিয়ে আছে।

দিল্লি বলছে ‘আমাদের কিছুই করার নেই’

৫ আগস্টের আয়োজন নিয়ে বাংলাদেশ সরকার আপত্তি জানানোর পর ভারত দ্রুত একটি আনুষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আয়োজন করছে। ভারত সরকার এর সঙ্গে জড়িত নয়। এফসিসির অনুষ্ঠানে কোনো বক্তব্য দেওয়া হলে সেটিকেও ভারত সরকারের সমর্থন হিসেবে দেখা যাবে না। এই বক্তব্যের মাধ্যমে নয়াদিল্লি মূলত দুটি বিষয় আলাদা করার চেষ্টা করে। একদিকে ভারত রাষ্ট্র। অন্যদিকে ভারতের রাজধানীতে অবস্থিত একটি স্বাধীন সাংবাদিক সংগঠন।

অর্থাৎ ভারতের অবস্থান ছিল শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও এবং নয়াদিল্লির কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মঞ্চ থেকে বক্তব্য দিলেও সেটির দায় ভারত সরকারের নয়। কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি এত সরল নয়। কারণ শেখ হাসিনা শুধু ভারতের মাটিতে অবস্থান করছেন না; বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে এবং তাঁকে ফেরত পাঠানোর জন্যও কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যেই ভারতের রাজধানীতে একটি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন তাঁকে কেন্দ্র করে আয়োজন করে ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামের অনুষ্ঠান।

আয়োজক বলছেন, ‘সমস্যা দেখি না’

ভারত সরকার যখন আয়োজনটির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক অস্বীকার করছে, তখন এফসিসি সভাপতি ওয়ায়েল আওয়াদের বক্তব্যে ভিন্ন একটি বাস্তবতার ছবি দেখা যায়। ডেইলি ওয়াদা তাঁকে প্রশ্ন করেছিল ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে যে অবস্থান নিয়েছে, তার সঙ্গে এফসিসির এই আয়োজন সাংঘর্ষিক হতে পারে কি না।

জবাবে আওয়াদ বলেন, তাঁর মনে হয় না বিষয়টি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে। কারণ এফসিসি স্বাধীন। সরকারে-সরকারে যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারই দেখবে। এফসিসির দায়িত্ব সাংবাদিক এবং জনগণকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়া। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা যে ভারতে আছেন, সেটি কোনো গোপন বিষয় নয়। তিনি বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করেছেন। সে কারণে একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর বক্তব্য সরাসরি শোনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনটির শিরোনামে ভারত সরকারের ‘আপত্তি নেই’ এমন ভাষা ব্যবহার করা হলেও প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে আওয়াদ কোথাও বলেননি যে ভারত সরকার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে বা সরকার তাঁকে সরাসরি জানিয়েছে যে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তিনি মূলত বলেছেন তাঁর নিজের বিবেচনায় এটি সমস্যা হওয়ার কথা নয়, কারণ এফসিসি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান।

ফলে এটিকে সরাসরি ভারত সরকারের ‘স্বীকারোক্তি’ বলা যাবে না। কিন্তু এখান থেকেই আরেকটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয় ভারতের রাজধানীতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বাংলাদেশের ধারাবাহিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এমন একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আয়োজন নির্বিঘ্নে হতে পারল কীভাবে?

শুধু জায়গা ভাড়া নয়, সরাসরি আয়োজক এফসিসি

ঘটনাটির গুরুত্ব এখানেই যে ৫ আগস্টের আয়োজনটি শুধু এফসিসির ভবনে অনুষ্ঠিত কোনো বাইরের সংগঠনের অনুষ্ঠান ছিল না। এফসিসি নিজেই এর আয়োজক। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানটির বিষয়ও নির্ধারিত হয়েছিল—‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’। সেখানে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের পরিকল্পনা এবং দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বলবেন বলে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। ফাইলে সংরক্ষিত ডেইলি ওয়াদার সাক্ষাৎকারেও এফসিসি আয়োজিত অনুষ্ঠান হিসেবে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫ আগস্ট অনুষ্ঠানটি বাস্তবেও হয়।

শেখ হাসিনা দৃশ্যসহ উপস্থিত না হয়ে সরাসরি কণ্ঠের মাধ্যমে যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি করেন এবং বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানান। অনুষ্ঠানটিতে সজীব ওয়াজেদ জয় ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিরাও অংশ নেন। এর ফলে আয়োজনটি নিছক সাংবাদিকতার সাক্ষাৎকারে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরার বড় একটি মঞ্চে পরিণত হয়।

সম্পর্কও নতুন নয়

এফসিসি ও আওয়ামী লীগের যোগাযোগও ৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ নয়াদিল্লির এফসিসিতে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় করেছিলেন। তৎকালীন বাংলাদেশ হাইকমিশনারও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এর অর্থ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় থেকেই দিল্লির এই আন্তর্জাতিক সাংবাদিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি ছিল।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি আবার এফসিসি প্রাঙ্গণে শেখ হাসিনার ধারণকৃত বক্তব্য প্রচার করা হয়। তবে সেই অনুষ্ঠানটি এফসিসি নিজে আয়োজন করেছিল কি না, তার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সম্পর্ক আরও সরাসরি হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের একটি পত্রিকায় শেখ হাসিনার বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন এফসিসির বর্তমান সভাপতি ওয়ায়েল আওয়াদ। সেখানে বাংলাদেশের নির্বাচন, আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে শেখ হাসিনা বিস্তারিত কথা বলেন। অর্থাৎ ধারাবাহিকতাটি দাঁড়ায়-

  • ক্ষমতায় থাকাকালে এফসিসির সঙ্গে সরকারি যোগাযোগ
  • এরপর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বক্তব্য এফসিসি প্রাঙ্গণে
  • তারপর এফসিসি সভাপতির সঙ্গে শেখ হাসিনার সরাসরি সাক্ষাৎকার
  • এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে এফসিসির নিজস্ব আয়োজন।
  • বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ, হাসিনাকেও আমন্ত্রণ

ওয়ায়েল আওয়াদের সাক্ষাৎকারের আরেকটি অংশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, এফসিসি একতরফাভাবে শেখ হাসিনাকে সুযোগ দিচ্ছে না। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান তুলে ধরতে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকেও তিনি দুবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

আওয়াদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ জানুয়ারি থেকে তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে এফসিসিতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেওয়ার অনুরোধ করে আসছিলেন। সেটি ছিল শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানোর আগের ঘটনা। কিন্তু বাংলাদেশের হাইকমিশনার সেখানে যাননি। এই বক্তব্য সত্য হলে এফসিসি নিজেদের অবস্থানকে ‘দুই পক্ষকেই কথা বলার সুযোগ দেওয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের আপত্তি ছিল ভিন্ন জায়গায়। বাংলাদেশের বক্তব্য শেখ হাসিনা ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন এবং দিল্লি তাঁকে সেই সুযোগ দিচ্ছে। এর আগেও, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার এফসিসি-সংলগ্ন বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষোভ জানিয়েছিল। সরকারের তথ্যবিবরণীতে বলা হয়, ভারতের রাজধানীতে তাঁকে এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু কে আয়োজক সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা হলো ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এমন রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না।

তাহলে ‘ডাবল গেইম’ কোথায়?

ভারতের সরকারি বক্তব্য এবং বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিপরীতমুখী চিত্র পাওয়া যায়। প্রথমত, ভারত বলছে শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতেই অবস্থান করে সেই অনুষ্ঠানে যুক্ত হচ্ছেন। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য বন্ধে একাধিকবার আপত্তি জানানো হয়েছে। চতুর্থত, তার পরও দিল্লির একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন তাঁকে কেন্দ্র করে আগে থেকে ঘোষিত অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পেরেছে। পঞ্চমত, সেই সংগঠনের সভাপতি বলছেন, এটি সমস্যা হওয়ার কথা নয় এবং এফসিসি স্বাধীন।

এই বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের দিক থেকে প্রশ্ন উঠতেই পারে ভারত কি আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে রাখছে, কিন্তু বাস্তবে তাকে এমন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিসরও দিচ্ছে?

এটিকেই রাজনৈতিক ভাষায় ‘ডাবল গেইম’ হিসেবে দেখা হতে পারে। তবে বর্তমান প্রকাশ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলা যাবে না যে ভারত সরকার গোপনে এফসিসিকে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছে কিংবা শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যবস্থা করেছে। এমন কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই।

‘সম্পৃক্ত নই’ আর ‘আপত্তি নেই’ এক বিষয় নয়

এখানে পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য এখানেই। ভারত বলছে ‘আমরা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নই।’ আর এফসিসি সভাপতি মূলত বলছেন ‘আমরা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান; আমার মনে হয় না এতে সমস্যা হওয়ার কথা।’

এই দুটি বক্তব্য পরস্পরকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে না। কারণ একটি বেসরকারি সংগঠন স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারে এবং সরকার সেটির আনুষ্ঠানিক আয়োজক না-ও হতে পারে। কিন্তু কূটনৈতিক প্রশ্নটি থেকে যায়। যখন বাংলাদেশের সরকার বারবার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে, তখন ভারতের রাজধানী থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের প্রধানের নিয়মিত রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া কি কেবল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার বিষয়?

নাকি দিল্লি একদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক যোগাযোগের জন্য কার্যকর পরিসরও অক্ষুণ্ন রাখছে? এ প্রশ্নের উত্তর ভারত সরকার এখনো বিস্তারিতভাবে দেয়নি।

আয়োজনের পরও দিল্লির একই অবস্থান

৫ আগস্ট অনুষ্ঠান হওয়ার পরও ভারত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবার জানায়, বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, ভারত সরকার তা সমর্থন করে না এবং এর সঙ্গে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার অনুষ্ঠানটির তীব্র সমালোচনা করে। শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর বলেও সতর্ক করা হয়। ফলে ‘বেসরকারি অনুষ্ঠান’ যুক্তি দিয়ে দিল্লি নিজেকে দূরে রাখলেও বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক অস্বস্তি এড়াতে পারেনি।

ভারত সরকারের জন্য সুবিধাজনক দূরত্ব?

পুরো ঘটনাপ্রবাহ থেকে আরেকটি বিষয় সামনে আসে। এফসিসির মতো স্বাধীন সংগঠন শেখ হাসিনাকে মঞ্চ দিলে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে পারে—এটি রাষ্ট্রের আয়োজন নয়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে থেকেই নিজের রাজনৈতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। এর ফলে একটি ধরনের সুবিধাজনক দূরত্ব তৈরি হয়। ভারতকে সরাসরি আয়োজকের দায় নিতে হচ্ছে না। আবার শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকারও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি ভারতের পরিকল্পিত নীতি কি না, তার প্রমাণ নেই। কিন্তু বাস্তব ফলাফলটি এমনই। আর সেখানেই বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্য দিল্লির অবস্থান নিয়ে সন্দেহ ও অস্বস্তির জায়গা তৈরি হচ্ছে।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা

পুরো ঘটনার পরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানোর আগে এফসিসি কি ভারত সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল? ভারতের নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক কোনো প্রতিষ্ঠানকে কি অনুষ্ঠানটির বিষয়ে জানানো হয়েছিল? শেখ হাসিনা কোথা থেকে সরাসরি কণ্ঠে যুক্ত হয়েছিলেন? সেই যোগাযোগের কারিগরি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কে করেছিল? ভারতের কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ এফসিসিকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল কি না যে অনুষ্ঠানটি নিয়ে তাদের আপত্তি নেই? ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘ভারত সরকারের আপত্তি নেই’ বললেও ওয়ায়েল আওয়াদের প্রকাশিত উত্তরে এমন কোনো সরকারি যোগাযোগের বর্ণনা নেই। বরং সেটি তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন।

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ভারতের ‘ডাবল গেইম’কে প্রমাণিত রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে ঘোষণা করা যাবে না।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে

দিল্লি প্রকাশ্যে বলছে- শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু একই দিল্লিতে শেখ হাসিনা অবস্থান করছেন; সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য আসছে; তাঁর দলের নেতারা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে হাজির হচ্ছেন; এফসিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সংগঠন তাঁকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান আয়োজন করছে এবং সংগঠনটির সভাপতি বলছেন, এ ধরনের আয়োজনকে তিনি সমস্যা হিসেবে দেখছেন না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার ধারাবাহিকভাবে দিল্লিকে জানিয়ে আসছে, ভারতের মাটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই বাংলাদেশের সামনে ভারতের নীতির সবচেয়ে বড় অস্পষ্টতা।

দিল্লি যদি সত্যিই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়, তাহলে বাংলাদেশের ধারাবাহিক আপত্তির পরও ভারতের ভূখণ্ড থেকে তাঁর রাজনৈতিক প্রচারণার সুযোগ কীভাবে অব্যাহত থাকছে? আর যদি এটিকে শুধুই স্বাধীন গণমাধ্যমের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ভারত সরকার বাংলাদেশের উদ্বেগ নিরসনে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ঘিরে নয়াদিল্লির নীতি নিয়ে ‘ডাবল গেইমের’ প্রশ্নও সহজে থামছে না।