বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তাপ
পুশ-ইন প্রশ্নে সরকারের নীরবতা, রাজপথ ও সংসদের রাজনীতিতে ধোঁয়াশা

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সীমান্ত এলাকাগুলোতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে একতরফাভাবে ‘পুশ-ইন’ বা অবৈধ অনুপ্রবেশ করানোর প্রবণতা আকস্মিক ও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সীমান্ত কেবল একটি দেশের ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণী রেখা নয়; এটি সংলগ্ন দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের ইতিহাস, চুক্তি, কূটনীতি এবং সীমানার দু’পাশে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সংবেদনশীল বাস্তবতা। তবে বর্তমানে সেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সীমান্ত এলাকাগুলোতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে একতরফাভাবে ‘পুশ-ইন’ বা অবৈধ অনুপ্রবেশ করানোর প্রবণতা আকস্মিক ও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারত থেকে পরিকল্পিতভাবে ধর্মানুভূতির সুযোগ নিয়ে বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের টার্গেট করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনমনে ক্ষোভ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। সীমান্তের ওপার থেকে মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, আর এপারে ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত শঙ্কা। তা সত্ত্বেও পুশ-ইন ইস্যুতে বর্তমান সরকারের অবস্থান এবং বিরোধী দলগুলোর কৌশলগত ভূমিকা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
সীমান্তে অদৃশ্য পরিসংখ্যান ও জনমনে গভীর উদ্বেগ
বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বিস্তৃত স্থলসীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম স্থলসীমান্তের একটি। ঐতিহাসিক চুক্তি এবং বন্ধুত্বের আন্তর্জাতিক বুলি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, ধারাবাহিক সীমান্ত হত্যা, এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ‘পুশ-ইন’ নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সীমান্তজুড়ে ঠিক কতজনকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সীমান্ত দিয়ে প্রকৃতপক্ষে এ পর্যন্ত কতজনকে অবৈধভাবে পুশ-ইন করা হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট, নির্ভুল বা প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য খোদ বাংলাদেশ সরকারের কোনো দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। এই তথ্যহীনতা এবং সমন্বয়হীনতা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জননিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১০ হাজারের পুশ-ইন দাবি: কলকাতায় সুর চড়ালেও ঢাকায় কেন নিশ্চুপ?
পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারের তথ্যহীনতার বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কলকাতার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভবনে সম্প্রতি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা ও বিরোধীদলীয় প্রধান শুভেন্দু অধিকারী একটি বিতর্কিত বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যে তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, ভারতের সীমানা থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার মুসলমানকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করা হয়েছে এবং আরও বহু মানুষকে বিভিন্ন সেন্টারে আটকে রাখা হয়েছে এপারে পাঠাবার জন্য।

ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের বিধানসভা থেকে প্রকাশ্যে আসা এ ধরনের গুরুতর দাবির পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর এই আশঙ্কাজনক ও বিস্ফোরক দাবির বিপরীতে দেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। সরকারের এই দীর্ঘ নীরবতাকে সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একধরনের চরম সিদ্ধান্তহীনতা এবং কূটনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন।
সংসদের বাইরে সরব বিএনপি, কিন্তু জাতীয় সংসদে কেন ভূমিকা অস্পষ্ট?
পুশ-ইন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও প্রধান বিরোধী রাজনীতির দ্বিধান্বিত ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাদের কার্যক্রমে। রাজপথ ও বিভিন্ন রাজনীতিক সমাবেশে বিরোধী দল ও বিএনপির প্রথম সারির নেতারা পুশ-ইন নিয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর প্রদর্শন করছেন। তবে সংসদের ভেতরের চিত্রে ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয়।
সীমান্তের এই জলন্ত ইস্যু এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে জাতীয় সংসদে ১৪৭ বিধিতে একটি আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম। এই প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য ছিল সংসদের ফ্লোরে জাতীয় স্বার্থ, বিএসএফ-এর এহেন একতরফা কর্মকাণ্ড এবং সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনক ও বিস্ময়করভাবে সংসদের মূল অধিবেশন শুরুর পূর্ব মুহূর্তেই ওই প্রস্তাবটি স্থগিত করে দেওয়া হয়।
জনগণের রক্ত, ত্যাগ এবং জাতীয় স্বার্থের মতো সর্বোচ্চ স্পর্শকাতর ইস্যুতে উত্থাপিত একটি প্রস্তাব কেন আলোচনার মুখোমুখি না হয়ে স্থগিতের খাতায় তলিয়ে গেল- তা নিয়ে দেশের রাজনীতিতে বহু প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। রাজপথে এক সুর আর সংসদে অন্য নীরবতা বিরোধী দলগুলোর প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও জনমনে সৃষ্টি করেছে প্রবল বিতর্ক ও বিভ্রান্তি।
তবে সংসদের বাইরে আয়োজিত দলের এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভারতের পুশ-ইন বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, "ভারতে ধর্মের নামে উসকানি ও বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার- দেশের সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখে এবং কোনো ধরনের নতিস্বীকার না করেই যেকোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব অব্যাহত থাকবে।"
দায়িত্বশীলদের কূটনৈতিক উত্তর ও দীর্ঘায়িত ধোঁয়াশা
ভারতের একতরফা পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়ে গত ১৭ জুন জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে এবং সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ সরকার ভারতের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক স্তরে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।’ তবে বিএসএফের চলমান পুশ-ইন ঠেকাতে সরকার বাস্তবে কী ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে- তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসেনি।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকৃত অবস্থান ও অফিশিয়াল বক্তব্য জানতে সংবাদমাধ্যম 'বেঙ্গল লেন্স'-এর পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে সংসদের বাইরের এক সুনির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রাতের আঁধারে লোকজনকে পুশ-ইন করার মতো অনভিপ্রেত ও বেআইনি কর্মকাণ্ড থেকে ভারত সরকার বিরত থাকবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি। আমাদের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, দ্বিপক্ষীয় নিবিড় কূটনীতির মধ্য দিয়েই এই জটিল সমস্যার স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করে আনা সম্ভব হবে।
প্রতিমন্ত্রীর এই আশ আশ্বাসবাণী সত্ত্বেও বাস্তবে সীমান্ত পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর বাসিন্দাদের।
বিরোধী শিবিরের ভূমিকা এবং জামায়াত ও ১১ দলের অবস্থান
ভারতের অবৈধ পুশ-ইন ইস্যু মোকাবিলায় সংসদে বিরোধী জোট ও অন্যান্য দলগুলোর অবস্থানও নানামুখী সমালোচনার মুখোমুখি। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১-দলীয় রাজনৈতিক জোটের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন রাজপথে সভা, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেলেও জাতীয় সংসদের ভেতরে গিয়ে ইস্যুটিকে কূটনৈতিকভাবে বা সংসদীয় প্রক্রিয়ায় জোরালো করার মতো কার্যকর কোনো কৌশল চোখে পড়েনি।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সম্প্রতি এক বক্তব্যে সীমান্ত এলাকার মানুষদের উদ্দেশ্যে সরাসরি বার্তা দেন। তিনি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সংলগ্ন দেশের ৩২টি জেলার সর্বস্তরের সাধারণ জনগণকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাশে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোর আকুল আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা ও যেকোনো ধরনের ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের সীমান্ত এলাকার প্রতিটা নাগরিককে বিজিবির হাত শক্তিশালী করে জাতীয় স্বার্থে শক্ত প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।
রাজনৈতিক কৌশল নাকি কূটনৈতিক ব্যর্থতা?
৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে কাঁটাতার ও বিএসএফ-এর ক্রমবর্ধমান পুশ-ইন কার্যক্রম বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনসংখ্যার ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে তথ্য গোপন বা অস্পষ্টতা, অন্যদিকে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব স্থগিত করে দেওয়া- সব মিলিয়ে পুশ-ইন ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ও পররাষ্ট্রনীতি কার্যত প্রতিরক্ষাত্মক অবস্থানে রয়ে গেছে।
কূটনৈতিক আলোচনার নামে সীমান্ত নিয়ে যে ধীরগতির কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে, তা ভারতের একতরফা পুশ-ইন বন্ধে কতখানি কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিরোধী দলগুলোর সংসদের ভেতরের নীরবতা এবং সরকারের স্পষ্ট রূপরেখার অভাব সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এমএম/ইএফ
সাম্প্রতিক সংবাদ

জামায়াত ও আ.লীগ নিয়ে তারেক রহমানের ‘কথোপকথন’: অডিওটি এআই নির্মিত

ফের ভুয়া ফটোকার্ড পোস্ট করে গুজব ছড়ালেন সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা

৯ বছরের আগের ভিডিও ছড়িয়ে 'হাসিনা মারা যায়নি' দাবি আওয়ামীপন্থীদের

ফ্যাক্ট-চেকের নামে বিভ্রান্তি, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল

