Bengal Lens
লেন্স এক্সপ্লেইনার

বঙ্গোপসাগরে ‘BCMEC’ সমীকরণ

এশিয়ার নতুন ভূ-রাজনীতি, অর্থনৈতিক মেরুকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য

প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চায়না-মিয়ানমার-ইকোনমিক করিডোর (BCMEC)।
প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চায়না-মিয়ানমার-ইকোনমিক করিডোর (BCMEC)। | গুগল জেমিনি

বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল হলো দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিলনস্থল। পৃথিবীর মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি সিংহভাগ এবং জ্বালানি পরিবহনের প্রধান সমুদ্রপথগুলো এই অঞ্চলের ওপর দিয়েই গিয়েছে।

দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে বঙ্গোপসাগর এখন কেবল কোনো সাধারণ জলসীমা নয়। ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে অঞ্চলটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর বা BCMEC-কে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা ও ঝুঁকির সমীকরণ।

২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের বেইজিং সফর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আলোচনা এই করিডোরকে আবারও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

একদিকে চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ, অন্যদিকে ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ। সব মিলিয়ে BCMEC শুধু একটি অবকাঠামোগত সংযোগ প্রকল্প নয়, বাংলাদেশের জন্য এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষারও একটি বড় পরীক্ষা।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, BCMEC কি একটি অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবেই থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণের অংশ হয়ে উঠবে?

১. ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব

বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিলনস্থল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং সামুদ্রিক যোগাযোগের দিক থেকে এ অঞ্চলের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে পূর্ব এশিয়ায় জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল যুক্ত। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগপথ হিসেবেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

সামরিক দিক থেকেও ভারত মহাসাগরে নৌ-শক্তির উপস্থিতি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিবেচনায় বঙ্গোপসাগর গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বাংলাদেশের জন্য এই কৌশলগত গুরুত্বের অর্থ শুধু পরাশক্তির প্রতিযোগিতার অংশ হওয়া নয়। বরং এর ভৌগোলিক অবস্থানকে কীভাবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ইউনান
গুগল জেমিনি
  • ২. চীনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ: ‘মালাক্কা ডাইলিমা’ ও বিকল্প অর্থনৈতিক পথ

বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে BCMEC দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের যোগাযোগ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইউনান প্রদেশের জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ মালাক্কা প্রণালীকেন্দ্রিক সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিকল্প যোগাযোগপথের সন্ধান চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার হিসাবের অংশ।

তবে BCMEC-এর অর্থনৈতিক গুরুত্বকে সরাসরি চীনের কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের জায়গাটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য BCMEC-কে কঠোরভাবে একটি অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে দেখা উচিত, কোনো কৌশলগত অক্ষ হিসেবে নয়।

তিনি বলেন, “Equidistance is no longer neutrality but active hedging.” অর্থাৎ বাংলাদেশের সমদূরত্বের অবস্থান এখন নিছক নিরপেক্ষতা নয়, বরং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি সক্রিয় কৌশল।

তার মতে, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক সুযোগ নেওয়া, কিন্তু কোনো বৃহত্তর কৌশলগত বলয়ের অংশ না হওয়া।

৩. বাংলাদেশের সমীকরণ: অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার ও কৌশলগত লাভ-ক্ষতি

বাংলাদেশের জন্য BCMEC একদিকে আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে প্রকল্পটির সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ যুক্ত হলে বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

৩.১ বাংলাদেশের লাভ; তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাবনা

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও পরিবেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততাকে শুধু ভূরাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, তিস্তা বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অবস্থার কারণে বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না।

তার মতে, চীনের সঙ্গে সহযোগিতা এখানে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো manoeuvre হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং দীর্ঘদিনের অগ্রগতিহীনতার বাস্তবতায় বাংলাদেশ বিকল্প সহযোগিতার পথ খুঁজছে।

আঞ্চলিক পোর্ট ও ট্রানজিট হাব

চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মাতারবাড়ীকে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে উন্নত করা গেলে বাংলাদেশ নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের সব বন্দরকে একই ধরনের ভূমিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তার মতে, চট্টগ্রামকে কনটেইনার ও ট্রান্সশিপমেন্টের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। অন্যদিকে মাতারবাড়ীকে প্রকৃত গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে উন্নত করতে হবে। মোংলা ও পায়রার ভূমিকা হওয়া উচিত পরস্পরের পরিপূরক, প্রতিযোগিতামূলক নয়।

তিনি বলেন, একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে তৈরি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত ভূমিকা এবং কার্যকর hinterland connectivity।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান

BCMEC ঘিরে বিনিয়োগ বাড়লে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শিল্প স্থাপন, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অবকাঠামো বিনিয়োগের পাশাপাশি উৎপাদন, বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

৩.২ বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষতি ও ঝুঁকি

১. ঋণের ফাঁদ ও আর্থিক ঝুঁকি

মেগা অবকাঠামো প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটাসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রায়ই আলোচনায় আসে।

হাম্বানটোটার শিক্ষা নিয়ে অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের অবস্থান হলো, বিষয়টি শুধু চীনা ঋণের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ভাষায়, The lesson of Hambantota is not to say no to China, but to say no to bad terms to any country.

অর্থাৎ সমস্যা চীন থেকে ঋণ নেওয়ায় নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন কোনো প্রকল্পে সার্বভৌম গ্যারান্টি, ভবিষ্যৎ রাজস্বকে জামানত হিসেবে ব্যবহার কিংবা অস্বচ্ছ চুক্তির ধারা যুক্ত থাকে।

তার মতে, বাংলাদেশের উচিত প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন নিশ্চিত করা, স্বাধীনভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং দেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাতের একটি সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা।

২. কূটনৈতিক ভারসাম্যহীনতা

চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভারত ও পশ্চিমা অংশীদারদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে। একইভাবে কোনো অর্থনৈতিক প্রকল্পকে সরাসরি চীন-ভারত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের মতে, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত সক্রিয় ভারসাম্য রক্ষা। অর্থনৈতিক স্বার্থে চীনের সঙ্গে কাজ করা যাবে, আবার একই সঙ্গে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

৪. ভারতের গভীর উদ্বেগ: নিরাপত্তা সংকট ও ‘চিকেনস নেক’

ভারতের জন্য BCMEC-এর সম্ভাব্য প্রভাব অর্থনৈতিক বিষয়ের বাইরেও বিস্তৃত। শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্ভাব্য যোগাযোগ ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন হিসাব তৈরি করতে পারে।

চীনের বন্দর ও অবকাঠামো বিনিয়োগকে ঘিরে ভারতের ‘String of Pearls’ উদ্বেগও দীর্ঘদিনের। ভারত মনে করে, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি ভবিষ্যতে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতিকে সরাসরি কোনো সামরিক জোট বা কৌশলগত অক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের মতে, বাংলাদেশের জন্য মূল বিষয় হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা। তাঁর মতে, BCMEC-কে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে রাখাই বাংলাদেশের স্বার্থে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৫. মিয়ানমারের ভূমিকা: গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি- মিয়ানমার BCMEC-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ভঙ্গুর সংযোগ।

৫.১ মিয়ানমারের লাভ

চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়লে মিয়ানমার বন্দর, ট্রানজিট এবং জ্বালানি অবকাঠামো থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও এসব প্রকল্পের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

৫.২ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

BCMEC-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো নিরাপত্তা ও কর্তৃত্বের বিষয়টি। করিডোরটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। অথচ রাখাইন এখন মিয়ানমার সরকারের একক ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন পক্ষের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

22

অধ্যাপক সাহাব এনাম খান মনে করেন, রাখাইনের বর্তমান বাস্তবতা BCMEC-এর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‌‘Until a settled authority can secure and honour contracts there, BCMEC remains an aspiration drawn on a war map.’

অর্থাৎ এমন একটি স্থিতিশীল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত, যারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চুক্তিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম, ততক্ষণ BCMEC বাস্তব প্রকল্পের চেয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডের ওপর আঁকা একটি আকাঙ্ক্ষা হয়েই থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অধ্যাপক খানের মতে, প্রকল্পটি থেমে যাওয়া সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নয়। বরং অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন থেকেই বাংলাদেশ ও চীন যদি মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কোনো পক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটি বড় ধরনের আর্থিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

66

৭. ২০২৬ সালের মহাকূটনৈতিক পরীক্ষা: বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুপারিশ

ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতার মধ্যে বাংলাদেশ এখন একটি জটিল কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি।

কূটনৈতিক সমতা (Equidistance Policy): ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিকে বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে। চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ ও যোগাযোগ প্রকল্পের পাশাপাশি ভারতসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

কঠোর ঋণ মূল্যায়ন (Debt Sustainability Assessment): বড় প্রকল্পে ঋণের সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড, পরিশোধের শর্ত, সার্বভৌম গ্যারান্টি এবং রাজস্ব-ভিত্তিক জামানতসহ প্রতিটি শর্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।

বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা: শুধু চীননির্ভর না হয়ে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অংশীদারকে অবকাঠামো, বন্দর, ব্লু-ইকোনমি ও আঞ্চলিক সংযোগে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

বন্দরগুলোর বিশেষায়ন: চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, মোংলা ও পায়রাকে একই ধরনের প্রকল্পে পরিণত না করে প্রত্যেকটির জন্য নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ভূমিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

মিয়ানমার পরিস্থিতির সতর্ক পর্যবেক্ষণ: রাখাইনে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নগুলো স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

BCMEC কেবল একটি সড়ক, রেলপথ বা বন্দর সংযোগের পরিকল্পনা নয়। এটি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য কাঠামো, যার সঙ্গে একই সঙ্গে জড়িয়ে আছে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং মিয়ানমারের চলমান সংঘাত।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাই চীনকে বেছে নেওয়া বা ভারতকে পাশ কাটানো নয়। বরং অর্থনৈতিক সুযোগ নেওয়ার পাশাপাশি নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখা।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের বিশ্লেষণে, বাংলাদেশকে এমন কোনো চুক্তি বা প্রকল্পে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে অর্থনৈতিক লাভের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হয়। তাঁর দৃষ্টিতে, যে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ, চুক্তির শর্ত এবং প্রকল্পের বাস্তব অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা।

BCMEC বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হয়ে উঠবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে প্রকল্পটি কত বড় বা কত বিনিয়োগ আসছে তার ওপর নয়। বরং বাংলাদেশ কতটা ভালোভাবে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, চুক্তির শর্ত, ঋণের স্থায়িত্ব, মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য একসঙ্গে বিবেচনা করতে পারে, তার ওপর।