সায়েদাবাদ প্রকল্প: ব্যয় বাড়লো দুই দফায়, অজানা সূত্রে আসিফের ঘাড়ে দায় চাপালো কালবেলা

দুদক আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘সত্যতা’ বা ‘প্রমাণ’ পেয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও বিভ্রান্তিকর।
গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক কালবেলা ‘নেপথ্যে আসিফ মাহমুদ, সাড়ে ৪ হাজার কোটির প্রকল্প সাড়ে ১৬ হাজার কোটি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
পরবর্তীতে প্রতিবেদনটি বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যম কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজ, ডেইলি সানসহ আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
পরদিন প্রিন্ট সংস্করণে কালবেলা ‘ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা থাকাকালীন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ১০ শতাংশের কম থাকা সত্ত্বেও অনৈতিক সুবিধার্থে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে।
এর পরদিন, ৩ সেপ্টেম্বর, বসুন্ধরা গ্রুপের আরেকটি সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ প্রতিদিনে ‘ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার দুর্নীতির তদন্ত এখন জনতার দাবি’ শিরোনামে ‘মুক্তমত’ বিভাগে একটি কলাম প্রকাশিত হয়। কলামটি লেখেন অদিতি করিম। সেখানে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিসহ আরও বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
বেঙ্গল লেন্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব প্রতিবেদনে সায়েদাবাদ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতা ও ধাপে ধাপে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনের সময়ের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আগের ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘদিনের বাস্তবায়ন জটিলতার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়নি।
কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই একনেকের যৌথ সিদ্ধান্তকে আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত দুর্নীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, দুদক আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘সত্যতা’ বা ‘প্রমাণ’ পেয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও বিভ্রান্তিকর।
দুদকের মুখপাত্র আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, কমিশন কেবল অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি ভুলবশত ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি বলে ফেলেছিলেন এবং সাংবাদিকদের ওই শব্দটি ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধও জানিয়েছিলেন।
দুদকের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরাও বলছেন কারো বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান মানেই তিনি দোষী প্রমাণিত হন না
প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে
১। সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। এই ব্যয় বৃদ্ধির সময় আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন এটিকে তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২। আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনের সময় অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে প্রকল্পটির ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে এবং কাজের অগ্রগতি ১০ শতাংশের কম থাকা অবস্থায় ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে অনিয়ম বা আর্থিক স্বার্থ থাকতে পারে এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
৩। গন্ধর্বপুর প্রকল্পের তুলনায় সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বেশি হওয়াকে ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
শিরোনামে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা
কালবেলার ‘নেপথ্যে আসিফ মাহমুদ, সাড়ে ৪ হাজার কোটির প্রকল্প সাড়ে ১৬ হাজার কোটি’ প্রতিবেদনটির শিরোনাম পড়লে পাঠকের ধারণা হবে ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা থেকে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকায় পুরো ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আসিফ মাহমুদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
কিন্তু বিডিনিউজের ২০২১ সালের ৫ অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেজ-৩)’ প্রকল্পের ব্যয় এর আগেই প্রথম সংশোধনে ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রকল্পটির প্রথম বড় ব্যয় বৃদ্ধি ঘটে আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হওয়ার কয়েক বছর আগে যখন তিনি সরকারেই ছিলেন না।
বিডিনিউজের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের অক্টোবরে একনেক প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন অনুমোদন করে এবং ব্যয় ২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৬৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা করা হয়। একই প্রতিবেদনে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের বক্তব্যে ব্যয় বৃদ্ধির একটি কারণও উল্লেখ করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেঘনা নদীর তীরে শিল্পকার্যক্রম ও নদীদূষণের কারণে প্রকল্পের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয় বেড়েছিল।
মূল মেয়াদে শুরুই হয়নি প্রকল্পের কাজ
প্রথম আলোর ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ “৮ বছরেও অগ্রগতি নেই, ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা” প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম সংশোধনের পরও প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত মূল মেয়াদে প্রকল্পটির কাজ শুরুই করা যায়নি। মেঘনা নদীর পানি দূষণ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার টানাপোড়েন, অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর শর্ত পূরণে সময় লাগা এবং জমি অধিগ্রহণে বিলম্বের মতো বিষয়কে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির কারণ হিসেবে ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়।
কালবেলার প্রতিবেদনে যে ‘কাজের অগ্রগতি ১০ শতাংশেরও কম থাকা অবস্থায়’ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনা হয়েছে, সেটিও নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৩ সালের প্রথম আলোর প্রতিবেদনেই প্রথম সংশোধনের পর প্রকল্পের অগ্রগতি ৫ শতাংশের নিচে থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ কম অগ্রগতি, প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রথম দফা ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই ছিল।
দ্বিতীয় সংশোধনের অনুমোদন ও খরচ বৃদ্ধির কারণ
ব্যয় বৃদ্ধি সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের একক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং একনেকের মাধ্যমে অনুমোদিত একটি সরকারি সিদ্ধান্ত। ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ একনেক সভায় সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প (ফেজ-৩)-এর দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
পরে তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। খরচ বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যা থেকে পানি নেওয়া যাবে না। কারণ সেখানকার পানি অত্যধিক দূষিত এবং বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশ্রিত। শোধন খরচ অনেক বেশি হবে। তাই মেঘনা নদী থেকে পানি আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অগ্রগতি ও নদীর পানির প্রাপ্যতা সময়ে সময়ে দেখে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সে সময় তিনি প্রকল্পের খরচ বাড়লেও প্রকল্পটিকে শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়ার কথা বলেন। এ প্রকল্পের অগ্রগতি এবং নদীর পানির প্রাপ্যতা সময়ে সময়ে দেখে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেই একনেকে দেওয়া ব্যয় বৃদ্ধির এই কারিগরি ব্যাখ্যাটির ন্যূনতম উল্লেখ নেই। সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যটি তুলে না ধরার মাধ্যমে প্রতিবেদনটিতে একটি কাঠামোগত সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরেছে।
গন্ধর্বপুরের সঙ্গে অসম্পূর্ণ তুলনায় ব্যয়ের প্রশ্ন
সংবাদমাধ্যমগুলো সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে গন্ধর্বপুর প্রকল্পের সঙ্গে সায়েদাবাদের প্রকল্পের ব্যায়ের তুলনা করেছে। কালবেলা ও কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে গন্ধর্বপুর প্রকল্পে বেশি পানি শোধন ক্ষমতা ও দীর্ঘতর পাইপলাইন থাকা সত্ত্বেও এর ব্যয় প্রায় ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা, যা সায়েদাবাদ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম কেন।
এ বছরের ৬ জুলাই “ওয়াসার সাড়ে ৪ হাজার কোটির প্রকল্প এখন ১৬ হাজার কোটি টাকা” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে এশিয়া পোস্ট। ওই প্রতিবেদনে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েদাবাদ প্রকল্পের বেশি ব্যয়ের কারণ হিসেবে এর বেশি পানি শোধন ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেন।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গন্ধর্বপুর প্রকল্পের সক্ষমতা যেখানে ৫০ কোটি লিটার সেখানে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ এর শোধনাগারের সক্ষমতা ৯৫ কোটি লিটার। ফলে ব্যয় বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এই পানি আসবে মেঘনা থেকে। এর মধ্যে সাড়ে ২২ কোটি লিটার করে যাবে সায়েদাবাদ-১ ও ২ এ। বাকি ৫০ কোটি লিটার যাবে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ এ।’
প্রতিবেদনের ভেতরেই অভিযোগ অপ্রমাণিত হওয়ার কথা বলেছে কালবেলা
কালবেলা ও কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
তবে অভিযোগটি কার, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ অভিযোগ পাওয়া গেছে কিংবা কী ধরনের তথ্য বা নথির ভিত্তিতে এমন অভিযোগ করা হয়েছে প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
বিশেষ করে কালবেলার প্রতিবেদনে ‘এসব অভিযোগ’ বলা হলেও অভিযোগের নির্দিষ্ট উৎস বা অভিযোগকারী সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
একইভাবে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রকল্পটির বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় ‘আসতে পারে বলে জানা গেছে’। কিন্তু কার কাছ থেকে জানা গেছে, তিনি এ বিষয়ে তথ্য দেওয়ার অবস্থানে ছিলেন কি না কিংবা দুদকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নথি রয়েছে কি না সেটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
কালবেলা অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুললেও তার বক্তব্য নেওয়া হয়নি। এমনকি বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কিনা সেটিও উল্লেখ করা হয়নি।
রিপোর্টারের মৌখিক দাবির সাথে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ফারাক
সায়দাবাদ প্রকল্পের ব্যায় বৃদ্ধির দায় আসিফ মাহমুদের উপর চাপানোর প্রসঙ্গে কালবেলার প্রতিবেদক জাহিদ ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেঙ্গল লেন্স। প্রথমেই তিনি দাবি করেন সায়েদাবাদ প্রকল্পের বিষয়টি একটি বড় রিপোর্টের অংশ যা প্রিন্ট সংস্করণে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টে আসিফ মাহমুদের অনৈতিক সুবিধা বলতে ঠিক কী সুবিধা বোঝানো হয়েছে এমন প্রশ্নে তিন বলেন, ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা থেকে প্রকল্প ব্যায় ১১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। এটাকে আপনার কাছে অনৈতিক মনে হচ্ছে না?
আসিফ মাহমুদ কি অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন বা কোন সোর্সে আসিফ মাহমুদের অনৈতিক সুবিধার তথ্য পেয়েছেন প্রশ্ন করলে তিনি জানান, দুদক থেকে তথ্য দেওয়া হয়েছে। দুদকের ব্যক্তিরা তো সরকারি কর্মকর্তা, নাম সাধারণত প্রকাশ করা যায় না।
আসিফ দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রথম দফার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি স্পষ্টই।
রিপোর্টে আসিফ মাহমুদ বা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্য নেওয়া হয়নি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসিফ মাহমুদ এর সাথে কথা বলার জন্য আমি নিজে কল দিয়েছি, সে রিসিভ করেনি। রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পরে এনসিপি থেকে আমাদের অফিসে কল করা হয়। অফিস থেকে তাদের জানানো হয় তাদের যদি কোন বক্তব্য থাকে তা লিখে পাঠাতে, আমরা প্রকাশ করবো। তবে তারা এমন কিছু পাঠায়নি।”
আসিফ মাহমুদ: ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আমার একক বিষয় ছিল না
সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে বেঙ্গল লেন্সের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
কালবেলা তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশের আগে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে বলে যে দাবি করেছে, তা নাকচ করে দেন তিনি। আসিফ মাহমুদ বলেন, "আমার সাথে কোনো যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়নি। ওরা কখনোই যোগাযোগের চেষ্টা করে না, সবসময় এটা লেখে যে আমাকে পায় না।"
তিনি দাবি করেন, দুদকের বিষয়টি সামনে আসার পর কালবেলা ও কালের কণ্ঠ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তথ্য গোপন করে তাকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করছে।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আসিফ মাহমুদ বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, "প্রজেক্টের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি একদম প্রি-ওয়ার্ক স্টেজেই এক দফায় আওয়ামী লীগের সময় বাড়ানো হয়েছে। তখনকার একনেক মিটিংয়েই বলা হয়েছিল যে, আশেপাশের নদী থেকে এটা করা সম্ভব হবে না, মেঘনা থেকে করতে হবে। সেক্ষেত্রে বাজেট দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এটা তখনই বলা হয়েছিল।"
বিদেশি অর্থায়ন ও সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রসঙ্গে তিনি জানান, এ ধরনের মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিদেশি সহযোগী সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকে এবং বিস্তারিত স্টাডি করা হয়। সেই স্টাডির ভিত্তিতেই পুরো প্রজেক্টের বাজেট ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো নির্ধারণ করে বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
ব্যয় বৃদ্ধিতে তার ব্যক্তিগত 'আগ্রহ বা স্বার্থ' থাকার বিষয়ে ওয়াসার কিছু সূত্রের যে অভিযোগ কালবেলার প্রতিবেদক উল্লেখ করেছিলেন, সেটিকে অবাস্তব বলে দাবি করেন আসিফ।
তিনি বলেন, "এটি কোনো ৩০০ বা ৫০০ কোটি টাকার ছোট প্রজেক্ট নয়। এটি একটি ন্যাশনাল প্রজেক্ট। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সবকিছু স্টাডি করে এটি নির্ধারণ করেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের খুব বেশি কাজ ছিল না। মূলত বিদেশি ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তাগিদে ফাইলটি দ্রুত ছাড়তে হয়েছিল এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের একনেক সভায় এই ব্যয় বৃদ্ধি পাস হয়।"
সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য গোপনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, "মাঝখানে যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাজেট বাড়ানো হয়েছিল সেটি ওনারা দেখায়নি। ওনারা পুরো নিউজে এই আলোচনাটাই গায়েব করে দিয়েছেন। এমনভাবে ফ্রেমিং করেছেন যেন এই প্রজেক্ট আমার সময় শুরু হয়েছে এবং আমি এটার হর্তাকর্তা।"
‘প্রাথমিক সত্যতা’ বলতে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন দুদকের মুখপাত্র
দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্যের বরাত দিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এখন টিভি, ভোরের কাগজ, নিউজজি২৪, মাছরাঙ্গা, আর টিভি এবং চ্যানেল২৪সহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ‘প্রাথমিক সত্যতা’ না লিখে সরাসরি ‘সত্যতা’ বা ‘প্রমাণ’ পাওয়ার কথাও শিরোনামে উল্লেখ করে।
পরে দুদক বিটের সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন আকতারুল ইসলাম।
তিনি সেখানে লেখেন, “কথা বলতে গিয়ে সম্ভবত প্রাথমিক সত্যতা শব্দ বলে ফেলেছি। ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি না রাখার বিনীত অনুরোধ করছি। ভিডিওতে থাকলে সেটিও এডিট করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।”
এ ব্যাপারে বেঙ্গল লেন্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে দুদকের মুখপাত্র আকতারুল ইসলাম তাঁর ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বলেন, “আমি মূলত বোঝাতে চেয়েছিলাম অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, চূড়ান্ত সত্যতা বা প্রমাণ পাওয়ার বিষয়টি সেভাবে বোঝাতে চাইনি। আসলে মূল বিষয় হয়েছে যে আমরা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে হয় কী, অভিযোগগুলো মানে সঠিকতা যাচাই করে, মানে প্রাথমিকভাবে যাচাই করা হয়, যাচাই করে তারপর সিদ্ধান্ত হয়, অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত মূলত এই। প্রাথমিকভাবে যদি কমিশন মনে করে যে না অভিযোগগুলোর সঠিকতা আছে সেক্ষেত্রে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়।”
তিনি আরো বলেন, “এর আগে শব্দ আমরা উচ্চারণ করতাম যে প্রাথমিক সঠিকতা পরিলক্ষিত হলে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিই। আমি যেটা বলতে চেয়েছি মূলত আসলে এই অভিযোগে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঐ প্রাথমিক সত্যতা মূলত আমি ঐদিকে যাইতে চাইনি, এইটা হয়েছে বিষয়।”
‘অনুসন্ধান মানেই দোষী প্রমাণিত হওয়া নয়’ বলছেন দুদকের আইনজীবী
দুদকের অনুসন্ধান শুরু মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দোষী কিনা জানতে চাইলে দুদকের আইনজীবী খান মো. মঈনুল হাসান বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, কারো বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেই যে সে দোষী হবে এমন কোন কথা নাই। সাধারণত একটা তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে যাওয়া হয়। অনেকসময় সে তথ্য সঠিক নাও হতে পারে, সে দোষী সাব্যস্ত নাও হতে পারে। অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না কে দোষী কে নির্দোষী। তাই অনুসন্ধানই সর্বশেষ বক্তব্য না।
এই ইস্যুতে গণমাধ্যমের নেগেটিভ ফ্রেমিং সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণমাধ্যম তার (আসিফ মাহমুদ) বিরুদ্ধে 'দুদকের অনুসন্ধান শুরু' এভাবে লিখতে পারতো।
তদন্তের আগেই ‘সত্যতা’ দাবি আইনি নীতির পরিপন্থি বলছেন মানবাধিকারকর্মী
গবেষক, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অন্যতম মূল নীতি হলো, আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিই আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ। কোনো অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন সময়েই "অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে" বা "প্রাথমিক সত্যতা" পাওয়ার মতো ভাষা ব্যবহার করা অত্যন্ত সমস্যাজনক। এ ধরনের বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আইনি অধিকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন, "অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে" কথাটির অর্থ দাঁড়ায় তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু যেখানে তদন্ত এখনও শুরুই হয়নি, সেখানে কোনো কর্মকর্তার এ ধরনের কথা বলা বা কোনো মহলের তা প্রকাশ করা মোটেও উচিত নয়। তদন্তের পরই কেবল নিশ্চিত হওয়া সম্ভব যে অপরাধের সঙ্গে কে যুক্ত এবং সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
গণমাধ্যমকে প্রচার মাধ্যম উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো প্রতিবেদন বা সংবাদ তৈরির ক্ষেত্রে পুরো প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে তুলে ধরা আবশ্যক। কিন্তু দেশের বহুল প্রচারিত ও প্রচলিত গণমাধ্যমগুলোর কাছ থেকে যে ধরনের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা হয়, বাস্তবে তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সংবাদ

সারের জন্য কৃষক নিহতের ঘটনা ১৯৯৫ সালে, সংসদে ভুল তথ্য দিলেন জামায়াত এমপি ও বিএনপির চিফ হুইপ

‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ নিয়ে জামায়াত নেতার খণ্ডিত ভিডিও প্রচার করলেন প্রতিমন্ত্রী নুর

নিষিদ্ধ আ.লীগ-সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ মামলার মূল আসামি নোবেল এখনও ইত্তেফাকের সাংবাদিক!

ওয়াই-ফাই এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে মুফতি জয়নাল আবেদিন কাদেরী ও ডা. নাবিলের দাবিগুলো কতটা সত্য!

