ওয়াই-ফাই এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে মুফতি জয়নাল আবেদিন কাদেরী ও ডা. নাবিলের দাবিগুলো কতটা সত্য!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের অফিশিয়াল বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক বা ওয়াই-ফাই থেকে যে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি (RF) সিগন্যাল নির্গত হয়, তা অত্যন্ত দুর্বল। মোবাইল টাওয়ার বা বেস স্টেশনের চেয়েও এর শক্তি অনেক কম।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে মুফতি জয়নাল আবেদীন আল কাদেরীর একটি ওয়াজের ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে ওয়াইফাই ব্যবহারের বেশকিছু ক্ষতিকর দিক তুলে ধরেছেন তিনি। যেখানে ৩টি দাবি করেছেন এই ইসলামিক বক্তা। ভিডিওটি দেখুন এখানে, এখানে।
১. ওয়াইফাই রাউটার যে রুমে থাকে, সেই রুমের চারা গাছ এক ইঞ্চিও বড় হবে না; কিন্তু রাউটারহীন রুমের চারা গাছ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে।
২. ওয়াইফাই রেডিয়েশনের কারণে নারীরা মা হতে পারছেন না এবং গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
৩. ওয়াইফাই রেডিয়েশন শক্তিশালী হওয়ার কারণে বুনো জঙ্গলের পাখিগুলো মারা যাচ্ছে এবং কাক, ময়না ও বাবুই পাখির মতো পাখি এখন আর আগের মতো দেখা যায় না।
এছাড়া ২০২৫ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডা. নাবিলের একটি বক্তব্য, যিনি বাংলাদেশে একজন জনপ্রিয় পাবলিক স্পিকার হিসেবে পরিচিত। যেখানে তিনি ওয়াইফাই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বলতে গিয়ে দাবি করেছেন, “বেডরুমের মধ্যে ওয়াইফাই রাউটার রাখবেন না, রাখলে ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ফোর্স ব্রেনের মধ্যে প্যাঁচ লাগিয়ে দেবে, যার কারণে ঘুম ঠিক মতো হবে না।”
বেঙ্গল লেন্স দেখার চেষ্টা করেছে, দুই বক্তার এই ৪টি দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত।
দাবি ১. ‘ওয়াইফাই রাউটার যে রুমে থাকে, সেই রুমের চারা গাছ বড় হয় না; কিন্তু রাউটারহীন রুমের চারা গাছ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে’।
গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার দাবিটির উৎস মূলত একটি স্কুলের বিজ্ঞান প্রজেক্ট। যা ২০১৩ সালে ডেনমার্কের একটি স্কুলে ৯ম শ্রেণীর ৫ জন ছাত্রী একটি বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্ট হিসেবে পরীক্ষা করেছিল। এর জন্য তারা কিছু হ্যারিকেন বা গার্ডেন ক্রেস উদ্ভিদের বীজ দুটি আলাদা রুমে রাখে। একটি রুমে সাধারণ পরিবেশ ছিল এবং অন্য রুমে বীজগুলোকে দুটি ওয়াইফাই রাউটারের পাশে রাখা হয়েছিল। ১২ দিন পর দেখা যায়, রাউটারের পাশে থাকা বীজগুলো ঠিকমতো অঙ্কুরিত হয়নি এবং অনেকগুলো মারা গেছে। এই খবরটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দাবিটি "ওয়াইফাই থাকলে গাছ বড় হয় না" হিসেবে রটে যায়। এ সংক্রান্ত Waldorf Today প্রকাশিত ২০১৩ সালের সংবাদটি দেখুন এখানে। বাংলা অনুবাদ পড়ুন এখানে।
কিন্তু The Guardian এ প্রকাশিত ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে চারা গাছগুলো মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানান যে, চারা গাছগুলো বাদামী হয়ে যাওয়ার কারণ ওয়াইফাই রেডিয়েশন নয়। বরং রাউটারের তাপ। ওয়াইফাই রাউটার চলার সময় মৃদু তাপ উৎপন্ন করে। চারা গাছগুলো রাউটারের একদম কাছাকাছি থাকার কারণে ট্রে-তে থাকা মাটি দ্রুত শুকিয়ে গিয়েছিল। ফলে শিক্ষার্থীরা দুটি রুমেই সমান পরিমাণ পানি দিলেও, রাউটার থাকা রুমের চারাগুলোর জন্য সেই পানি পর্যাপ্ত ছিল না এবং সেগুলো শুকিয়ে চারা মরে বাদামী রং ধারণ করেছিল। প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদ পড়ুন এখানে।
দাবি ২. ‘ওয়াইফাই রেডিয়েশনের কারণে নারীরা মা হতে পারছেন না এবং গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
অস্ট্রেলিয়ান রেডিয়েশন প্রোটেকশন অ্যান্ড নিউক্লিয়ার সেফটি এজেন্সি (ARPANSA) এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, ওয়াই-ফাই রাউটার সাধারণত মাত্র ০.১ ওয়াট (১০০ মিলিওয়াট) শক্তিতে কাজ করে। এটি একটি নন-আয়োনাইজিং (Non-ionizing) বা মৃদু মানের তেজস্ক্রিয়তা।
এক্স-রে বা ইউভি রশ্মির মতো ক্ষতিকর রেডিয়েশনের ডিএনএ বা কোষ ভেঙে ফেলার ক্ষমতা থাকে, কিন্তু ওয়াই-ফাই তরঙ্গের সেই শক্তি বা ক্ষমতা একেবারেই নেই। ফলে গর্ভবতী নারী, গর্ভের সন্তান কিংবা ভ্রূণের কোনো ধরনের ক্ষতি (যেমন: গর্ভপাত বা শারীরিক সমস্যা) হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা প্রমাণ নেই। ARPANSA এর প্রকাশিত প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদ পড়ুন এখানে।
এছাড়া Haptic-networks এ ‘মিথ বাস্টার্স: ওয়াইফাই নিরাপত্তা’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গর্ভবতী নারী বা গর্ভের সন্তানের বিকাশের ক্ষেত্রে ওয়াইফাই ব্যবহারের কোনো ঝুঁকি বা ক্ষতিকর প্রভাব প্রমাণিত হয়নি। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো গর্ভাবস্থায় ওয়াইফাই ব্যবহারকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে সমর্থন করে। প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদ।
দাবি ৩. ‘‘ওয়াইফাই রেডিয়েশন শক্তিশালী হওয়ার কারণে বুনো জঙ্গলের পাখিগুলো মারা যাচ্ছে এবং কাক, ময়না ও বাবুই পাখির মতো পাখি এখন আর আগের মতো দেখা যায় না।’’
আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই; এটি মূলত একটি পরিবেশগত গুজব। পাখিদের হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রেডিয়েশন নয়, বরং মানুষের তৈরি পরিবেশগত বিপর্যয়ই প্রধান কারণ।
পাখিরা হারিয়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণ:
পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের চারপাশের পাখিরা মূলত যেসব কারণে হারিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম বাসস্থানের তীব্র সংকট। দ্রুত নগরায়ণ ও নির্বিচারে বড় বড় গাছ (যেমন—তালগাছ, নারিকেল গাছ ও বটগাছ) কেটে ফেলার কারণে পাখিরা বাসা বাঁধার স্বাভাবিক জায়গা হারাচ্ছে।
কীটনাশকের অতিব্যবহার: কৃষ জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিদের প্রধান খাদ্য (পোকা-মাকড় ও শস্যদানা) বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এটি তাদের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং অকালমৃত্যু ঘটাচ্ছে।
উঁচু টাওয়ার ও কাঁচের ভবনে ধাক্কা: রাতের বেলা বা কুয়াশায় উঁচু মোবাইল টাওয়ারের আলো ও শহরের বহুতল কাঁচের ভবনের প্রতিফলনে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা ধাক্কা খেয়ে মারা যায়।
খাদ্য ও পানির অভাব: কংক্রিটের আধুনিক শহরগুলোতে পাখিদের জন্য স্বাভাবিক খাবার ও দূষণমুক্ত পানির চরম অভাব রয়েছে।
প্রযুক্তিকে দায়ী করে আসল সমস্যাকে আড়াল করলে পাখিদের বাঁচানো সম্ভব নয়। পাখিদের ফিরিয়ে আনতে মোবাইল টাওয়ার বন্ধ করা সমাধান নয়, বরং প্রয়োজন: ব্যাপক বনায়ন ও সবুজায়ন বৃদ্ধি করা। ফসলের মাঠে ক্ষতিকর রাসায়নিকের বদলে জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা। পাখিদের জন্য নিরাপদ প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য গড়ে তোলা।
এ সংক্রান্ত গুজব নিয়ে ২০২০ সালের ২৯ এপ্রিল রয়টার্সের করা ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদ দেখুন এখানে।
দাবি ৪. ‘বেডরুমের মধ্যে ওয়াইফাই রাউটার রাখলে ঘুম ঠিক মতো হবে না।’
ডিজিটাল ফিজিওথেরাপি প্ল্যাটফর্ম fysiobasen থেকে প্রকাশিত Is It Dangerous to Sleep Next to a Wi-Fi Router? অর্থাৎ, ‘ওয়াইফাই রাউটারের পাশে ঘুমানো কি বিপজ্জনক?’ প্রতিবেদনে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ওয়াইফাই রেডিয়েশন কি ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে?
কিছু দাবি অনুসারে, ওয়াইফাই রাউটারের কাছাকাছি থাকা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, কারণ রেডিয়েশন মেলাটোনিন (Melatonin) হরমোনের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে—যা ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধকারে মেলাটোনিন উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায় এবং কিছু গবেষক মনে করেন যে তড়িৎ-চৌম্বকীয় রেডিয়েশন এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
তবে বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের ওপর ওয়াইফাই রেডিয়েশনের প্রভাব অতি সামান্য বা নগণ্য এবং ঘুমের যেকোনো ব্যাঘাতের জন্য মানসিক চাপ (Stress) বা ঘুমের দুর্বল অভ্যাসের (Poor sleep hygiene) মতো অন্যান্য কারণগুলোই বেশি দায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। fysiobasen এর প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদ পড়ুন এখানে।
ওয়াইফাই নিয়ে জনমনে ছড়ানো এসব বিষয়ে যা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের অফিশিয়াল বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক বা ওয়াই-ফাই থেকে যে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি (RF) সিগন্যাল নির্গত হয়, তা অত্যন্ত দুর্বল। মোবাইল টাওয়ার বা বেস স্টেশনের চেয়েও এর শক্তি অনেক কম। দীর্ঘ গবেষণার পর সংস্থাটি জানিয়েছে, "এখন পর্যন্ত সংগৃহীত সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থেকে এটি নিশ্চিত যে, ওয়াই-ফাই সিগন্যালের কারণে মানবশরীরে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো ধরনের নেতিবাচক স্বাস্থ্যঝুঁকি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।" বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদ পড়ুন এখানে।
ইন্টারনেটে বা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) রাউটারের রেডিয়েশন নিয়ে যে তথ্যটি ছড়ানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যবিষয়ক বড় বড় নিয়ন্ত্রক সংস্থার গবেষণায় যা প্রমাণিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের U.S. Food and Drug Administration (FDA) নিয়মিত এ ধরনের বেতার তরঙ্গের নিরাপত্তা সীমা পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দৈনন্দিন জীবনে আমরা যে মাত্রার ওয়াই-ফাই সিগন্যালের সংস্পর্শে আসি, তা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে শতগুণ নিচে থাকে। ফলে এটি মানবদেহ বা প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর নয়।
অতএব মুফতি জয়নাল আবেদিন আল কাদেরীর ওয়াজে ওয়াইফাই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে দাবিকৃত ৩টি দাবিই বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত। এছাড়া ওয়াইফাই এর কারণে ঘুম না হওয়ার বিষয়ে ডা. নাবিলের দাবিটিও গবেষণা অনুযায়ী শতভাগ নির্ভুল বলার সুযোগ নেই। কাজেই ওয়াই-ফাই রাউটার বাসাবাড়িতে রাখা এবং ব্যবহার করা গর্ভবতী নারী, শিশু ও গাছের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদই বলা যায়।
সাম্প্রতিক সংবাদ

নিষিদ্ধ আ.লীগ-সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ মামলার মূল আসামি নোবেল এখনও ইত্তেফাকের সাংবাদিক!

ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হামলা, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে চাপ

সময় টিভির আগস্ট মাসের ‘সম্পাদকীয়’ টকশোতে বিএনপির অতিথি ৩৬, জামায়াত ১৩, এনসিপি ১১

এল নিনো: সামনে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের শঙ্কা, কতটা প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে?

