ফ্যাক্ট চেক

সারের জন্য কৃষক নিহতের ঘটনা ১৯৯৫ সালে, সংসদে ভুল তথ্য দিলেন জামায়াত এমপি ও বিএনপির চিফ হুইপ

জাতীয় সংসদে সার সংকট নিয়ে আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর এমপি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ দাবি করেন, “সার সংকটের মধ্যে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউনভর্তী সরকারী সারের মজুদ আবার সেই ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সিন্ড্রোম, যখন এক বস্তা সারের পরিবর্তে আমার কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছিল।” একই ইস্যুতে তিনি আরও বলেন, “২০০১ থেকে ২০০৬ সাল বৌর মৌসুম শুরু হলো, সার পাচ্ছে না, সেসময় তো আমাদের গুলির মুখে পড়তে হয়েছিল। আমরা কি বাংলাদেশকে, আবার সেই কৃষকদেরকে গুলির মুখে ফেলতে চাচ্ছি?”

পরে তাঁর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “আমরা ২০০১ সাল থেকে ০৬ সালে যখন সরকারে ছিলাম মাননীয় মতিউর রহমান নিজামী সাহেব আমাদের খুব শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি, তিনি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী। সে সময় কৃষকরা গুলি খেয়েছিল, এই গুলিটার ব্যবস্থা করেছিল তৎকালীন যারা এই দেশের উৎখাত চায়, এই দেশের ধ্বংস চায়, এই দেশের সকল কিছু ধ্বংস হোক চায় তারা।”

বেঙ্গল লেন্স প্রাসঙ্গিক কি ওয়ার্ড সার্চ করে উভয়ের দাবি যাচাই করে দেখেছে, সার সংকটের কারণে কৃষক নিহত হওয়ার ঘটনাটি বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ঘটেছে। তবে তা ২০০১-০৬ সালে নয়। সার সংকটকে কেন্দ্র করে কৃষকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির বহুল নথিভুক্ত ঘটনাটি ১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে ঘটে।

বেঙ্গল লেন্স (6)

এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৯৯৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, সার সংকট ও উচ্চমূল্যকে কেন্দ্র করে কৃষক ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় অন্তত দুই এলাকায় সরকারি গুদাম থেকে সার নেওয়ার চেষ্টা হলে পুলিশ গুলি চালায় এবং অন্তত ১৯ জন নিহত হন।

সমসাময়িক UPI প্রতিবেদনে ১৯৯৫ সালের মার্চের সার সংকটে ১৩ কৃষক নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়,দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১০টি জেলায় সার পরিবহন ও বিতরণের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করে বাংলাদেশ। এদিকে এক মাস ধরে পুলিশের সঙ্গে ক্ষুব্ধ কৃষকদের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে।” বিভিন্ন উৎসে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য থাকলেও ঘটনাটির সময়কাল ১৯৯৫ সাল, এ বিষয়ে সূত্রগুলো একমত। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করে। এই সরকার ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল।

এদিকে ‘জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ২০০১–০৬ সময় কৃষিমন্ত্রী ছিলেন’, চিফ হুইপের বক্তব্যের এই অংশটিও সঠিক নয়। নিজামী ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কৃষিমন্ত্রী এবং ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৩ সালের সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনেও তাঁকে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, সংসদে দেওয়া দুই সংসদ সদস্যের বক্তব্যেই একই ঐতিহাসিক ঘটনার সময়কাল ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সার নিয়ে কৃষকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির যে ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি ২০০১–০৬ সালের নয় বরং সেটি মূলত ১৯৯৫ সালের সার সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ২০০১–০৬ সময়কালে মতিউর রহমান নিজামীও পুরো সময় কৃষিমন্ত্রী ছিলেন না।

তাই শফিকুল ইসলাম মাসুদের ২০০১–০৬ সালের সঙ্গে কৃষক হত্যার ঘটনাকে যুক্ত করার দাবি এবং নুরুল ইসলাম মনির একই সময়কাল ও নিজামীর কৃষিমন্ত্রী থাকার বর্ণনা, দুটিই বিভ্রান্তিকর ও ঐতিহাসিকভাবে ভুল।