বিশেষ প্রতিবেদন

এল নিনো: সামনে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের শঙ্কা, কতটা প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে?

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতিটিকে আরও কঠোর ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এল নিনো মানুষের চোখের সামনেই 'সুপারসাইজড' হয়ে উঠছে এবং পৃথিবী প্রবেশ করছে 'অজানা পানিতে'। কিন্তু এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার পেছনে কী ঘটছে? আর এর অভিঘাত কোথায় গিয়ে থামতে পারে?

প্রশান্ত মহাসাগরের পানি শুধু উষ্ণ হচ্ছে না। উষ্ণতার মাত্রা ও গতিপথ এখন বিজ্ঞানীদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) বলছে, এল নিনো ইতোমধ্যে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে এটি আরও তীব্র হয়ে 'অত্যন্ত শক্তিশালী' পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই ঘটনা বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছালেও এর প্রভাব থামবে না তখনই। WMO-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, এমন স্পষ্ট পূর্বাভাস তাদের এল নিনো-লা নিনা পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতিটিকে আরও কঠোর ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এল নিনো মানুষের চোখের সামনেই 'সুপারসাইজড' হয়ে উঠছে এবং পৃথিবী প্রবেশ করছে 'অজানা পানিতে'। কিন্তু এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার পেছনে কী ঘটছে? আর এর অভিঘাত কোথায় গিয়ে থামতে পারে?

যে তাপ দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের গভীরেও

এল নিনোর শক্তি বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো প্রশান্ত মহাসাগর। মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানি যখন স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন সমুদ্রের ওপরের এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলের ওপরও প্রভাব ফেলে। পরিবর্তিত হয় বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক বিন্যাস।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠ নয়, সমুদ্রের নিচেও বিপুল উষ্ণতা জমা হয়েছে। WMO-এর সর্বশেষ পূর্বাভাসে মধ্য নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের Niño 3.4 অঞ্চলে আগামী মৌসুমে তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা আরও বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০২৬ মৌসুমে মডেলগুলোর গড় পূর্বাভাস প্রায় ৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা ১৯৯৭-৯৮ ও ২০১৫-১৬ সালের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি এল নিনোর চেয়েও বেশি। এর সর্বোচ্চ তীব্রতা নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে আসতে পারে।

অর্থাৎ, ঘটনাটি এখনো চূড়ায় পৌঁছায়নি। বরং বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, চূড়ান্ত তীব্রতা সামনে।

NOAA-এর হিসাবেও বাড়ছে শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের National Oceanic and Atmospheric Administration (NOAA)-এর Climate Prediction Center-ও এল নিনোর দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ মৌসুমে অত্যন্ত শক্তিশালী El Niño হওয়ার সম্ভাবনা এখন ৯০ শতাংশের বেশি — জুলাইয়ে এই সম্ভাবনা ছিল ৮১ শতাংশ, আগস্টের মূল্যায়নে তা আরও বেড়েছে, যা দেখায় প্রতি মাসেই পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড হওয়া ঘটনাগুলোর তুলনায় ঐতিহাসিকভাবে ব্যতিক্রমী শক্তিশালী El Niño হওয়ার সম্ভাবনা ৬৯ শতাংশ। এখানেই এবারের ঘটনাটির গুরুত্ব।

১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ — এই তিনটি El Niño আধুনিক রেকর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল। এবার সেই মাত্রাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি — 'রেকর্ড ভাঙার ৬৯ শতাংশ সম্ভাবনা' মানে রেকর্ড ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে নয়। এটি একটি পূর্বাভাস। অর্থাৎ বর্তমান সমুদ্র পরিস্থিতি ও মডেল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এল নিনো আসলে কী?

El Niño কোনো ঝড়ের নাম নয়। এটি প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক একটি বৃহৎ জলবায়ু প্যাটার্ন, যা পৃথিবীর এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এর দেখা মেলে। মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হলে বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে।

এর প্রভাব পড়ে-

  • বৃষ্টিপাতের ধরনে
  • তাপমাত্রায়
  • খরা ও বন্যার প্রবণতায়
  • কৃষি উৎপাদনে
  • পানির প্রাপ্যতায়
  • খাদ্যদ্রব্যের দামে
  • জনস্বাস্থ্যে
  • এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ও জীবিকায়

তাই প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া আসলে শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের ঘটনা নয়।

কোথাও বন্যা, কোথাও খরা

El Niño-এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো — এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে একই রকম নয়। কোনো অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা হতে পারে, অন্য অঞ্চলে দেখা দিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হতে পারে।

WMO বলছে, অত্যন্ত শক্তিশালী El Niño বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে যদি অন্যান্য সমুদ্রীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্যাটার্ন একই সময়ে সক্রিয় থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এবার ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল এবং আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণতার মতো অন্যান্য জলবায়ু উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে একটি দেশের জন্য ঠিক কী ঘটবে, তা শুধু 'El Niño আছে' — এই তথ্য দিয়ে বলা যায় না।

আসল বিপদ কি আবহাওয়ায়, নাকি খাবারে?

বন্যা কিংবা তাপপ্রবাহ চোখে দেখা যায়। কিন্তু El Niño-এর সবচেয়ে গভীর প্রভাব সম্ভবত দেখা যাবে খাদ্যের বাজারে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, ২০২৬-২৭ সালের El Niño-এর কারণে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অন্তত ৪ কোটি ৯০ লাখ অতিরিক্ত মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে যেতে পারে। ২০১৫-১৬ সালের El Niño প্রায় ৬ থেকে ১০ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করেছিল।

এখানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এমন জনগোষ্ঠী, যারা কৃষি ও মৌসুমি বৃষ্টির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। সেসব অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেলে ফসল কমবে। ফসল কমলে খাদ্যের সরবরাহ কমবে। সরবরাহ কমলে দাম বাড়তে পারে। আর দাম বাড়লে সবচেয়ে আগে চাপে পড়বে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।

অর্থাৎ El Niño-এর অভিঘাত শেষ পর্যন্ত একটি জলবায়ু সংকট থেকে খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

আফ্রিকা থেকে এশিয়া - ঝুঁকির মানচিত্র বড়

WFP-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসব অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার বড় অংশ মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। তবে ঝুঁকি আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং স্থানীয় বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

FAO ও WFP ইতোমধ্যে El Niño-এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও মানবিক সহায়তার পরিকল্পনা জোরদার করেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন বিপর্যয় ঘটার পর ত্রাণ দেওয়ার পরিবর্তে বিপর্যয়ের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে প্রস্তুত করার ওপর জোর দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সোয়াইন মনে করেন, ২০২৬ সালের এই এল নিনো ঘটনাটি ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ। এটি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তুঙ্গে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

নর্দার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান অধ্যাপক ভিক্টর জেনসিনি সতর্ক করে বলেন, একটি শক্তিশালী এল নিনো ২০২৬ সালের শেষভাগ ও ২০২৭ সালে বিশ্ব তাপমাত্রাকে নতুন রেকর্ড পর্যায়ে ঠেলে দিতে পারে। তার মতে, সমুদ্রে সঞ্চিত অতিরিক্ত তাপ কয়েক মাসের ব্যবধানে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা দেরিতে প্রকাশ পায়।

অ্যাকুওয়েদারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ পল প্যাস্টেলক ও টাইলার রয়েস বলেন, প্রতিটি এল নিনো একই রকম প্রভাব ফেলে না। উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, ২০১৫-১৬ সালের এল নিনো প্রচলিত ধারণার বিপরীতে ক্যালিফোর্নিয়ায় উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া এনেছিল, অথচ প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টি বাড়িয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ শক্তি বেশি হলেই যে প্রভাব সব জায়গায় এক রকম হবে, এমনটা নিশ্চিত নয়। রয়েস আরও বলেন, ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনো, আর ২০১৫-১৬ সালেরটি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ — এবারের ঘটনাটি সেই রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে (তবে পরিমাপ পদ্ধতিভেদে এই র‍্যাঙ্কিং কিছুটা ভিন্ন হতে পারে)।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা WMO-এর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেছেন, 'এল নিনো' শব্দের অর্থ স্প্যানিশ ভাষায় 'ছোট্ট বালক' হলেও এটি বিশ্বজুড়ে সম্প্রদায় ও অর্থনীতিতে বিশাল আঘাত হানার সামর্থ্য রাখে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ব্যতিক্রমী তীব্রতার এল নিনো মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যতিক্রমী মাত্রার প্রস্তুতি ও সাড়া।

WFP-এর খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জঁ-মার্তাঁ বাউয়ার খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে সতর্ক করে বলেন, অতীতে এই ধরনের ঘটনা বড় আকারের ক্ষুধা সংকট সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও বলেন, দাতা দেশগুলোর তহবিল হ্রাসের কারণে সংকট পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতির অবনতি দ্রুত শনাক্ত করা এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে — যাকে তিনি 'খাদ্য নিরাপত্তা তথ্যের ক্রমবর্ধমান খরা' বলে অভিহিত করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটা কোথায়?

El Niño-এর প্রভাব বাংলাদেশে সরাসরি কেমন হবে, এটি এক লাইনে বলা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের আবহাওয়া শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের El Niño দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল, মৌসুমি বায়ু, স্থানীয় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের জন্য তিনটি জায়গায় সতর্ক থাকা জরুরি।

প্রথমত: কৃষি — বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে আমন, বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ও সেচের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত: খাদ্যের দাম — বিশ্বের বড় কৃষি উৎপাদক অঞ্চলে উৎপাদন কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পৌঁছাতে পারে।

তৃতীয়ত: জনস্বাস্থ্য — অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং জলাবদ্ধতার মতো পরিস্থিতি মশাবাহিত রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তাই বাংলাদেশের জন্য El Niño-কে শুধু 'আন্তর্জাতিক আবহাওয়ার খবর' হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দ্য ডেইলি স্টারকে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ তরিকুল নেওয়াজ কবির জানিয়েছেন, এল নিনো মৌসুমি বায়ুর মাঝামাঝি সময়ে বা তারও পরে, অর্থাৎ বর্ষার শেষ দিকে সক্রিয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার ব্যাখ্যায় পুবালি বাতাস পূর্ব দিকে না গিয়ে পশ্চিমে বয়ে গেলে সমুদ্রস্রোতও সেদিকে সরে যায়। ফলে পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টি বাড়লেও বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়।

আবহাওয়া বিশ্লেষক আবুল কালাম মল্লিক সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশে অনেকে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিতভাবে 'সুপার এল নিনো' বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু বাস্তবে এর প্রকৃত প্রভাব যাচাই করতে হয় টেলিকানেকশন পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে। তার মতে, এল নিনো সক্রিয় হলে বর্ষাকালের আগমন কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে এবং বর্ষার বৃষ্টিপাতও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে — যদিও জলবায়ু সবসময় নির্দিষ্টভাবে আচরণ করে না বলে তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে রাজি হননি। তার আশঙ্কা, মৌসুমি বায়ুর আগমন বিলম্বিত হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও ভ্যাপসা গরম বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

উষ্ণ পৃথিবীর ওপর আরেকটি ধাক্কা

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো — El Niño কি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হচ্ছে? এখানে বৈজ্ঞানিকভাবে উত্তরটি এত সরল নয়। El Niño একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি El Niño সৃষ্টি করছে — এমন সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানীরা দেননি। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।

পৃথিবীর সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল আগে থেকেই উষ্ণ হচ্ছে। ফলে একটি শক্তিশালী El Niño এমন একটি উষ্ণ পটভূমির ওপর আঘাত করছে, যেখানে চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আগে থেকেই বেশি। WMO-ও বলছে, ব্যতিক্রমী উষ্ণ প্রশান্ত মহাসাগর এবারের El Niño-কে আরও শক্তিশালী হওয়ার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে। অর্থাৎ El Niño একা পুরো জলবায়ু সংকটের কারণ নয়, কিন্তু এটি বিদ্যমান সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

'সুপার' এল নিনোর সামনে প্রস্তুতি কতটা?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এই পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতা এবং প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। জাতীয় আবহাওয়া ও জলবিদ্যা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোকে প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ বিপর্যয় মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর সময় বিপর্যয়ের পর নয়, বরং বিপর্যয়ের আগে।

কৃষককে আগে সতর্ক করা গেলে ফসল রক্ষা করা যায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আগে প্রস্তুত করা গেলে রোগের চাপ সামলানো যায়। খাদ্য মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আগে প্রস্তুত করা গেলে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। এ কারণেই এবারের El Niño নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ সম্ভবত 'রেকর্ড' নয়। শব্দটি হলো — প্রস্তুতি।

সংকেতটি কি আমরা বুঝছি?

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে যে সংকেত আসছে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়। El Niño ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। আগামী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। বছরের শেষ দিকে এটি সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী El Niño হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু সম্ভাবনাটি এতটাই বাস্তব যে বিশ্বের শীর্ষ আবহাওয়া ও মানবিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে।

কারণ El Niño-এর আসল গল্প শুধু সমুদ্রের উষ্ণতা নয়। এর গল্প হলো — একটি উষ্ণ সমুদ্র কীভাবে বদলে দিতে পারে বৃষ্টি, বৃষ্টি কীভাবে বদলে দিতে পারে ফসল, ফসল কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে খাদ্যের দাম, আর খাদ্য সংকট কীভাবে কোটি কোটি মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। ২০২৬-২৭ সালের El Niño তাই শুধু একটি আবহাওয়ার ঘটনা নয়। এটি হতে পারে আগামী বছরের অন্যতম বড় বৈশ্বিক জলবায়ু ও মানবিক পরীক্ষা।