হাসিনা ভারতে থাকলে দিল্লি সফরে যাবেন না তারেক রহমান!

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ আশা করছে নয়াদিল্লি ঢাকার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোনো স্তম্ভকে আন্ডারমাইন করার মতো কোনো কর্মকাণ্ড আর হবে না।
শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি দিল্লি সফরে যাবেন না। কূটনৈতিক অঙ্গন থেকে রাজনৈতিক মহল, এমনকি সাধারণ মানুষের আলোচনাতেও এখন ঘুরছে এমন প্রশ্ন। এর মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সম্ভাব্য দিল্লি সফরের বিষয়টি।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে দৃশ্যমান টানাপোড়েন তৈরি হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি। ২০২৫ সালে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের পোশাক আর পাট ঢোকা বন্ধ করেছিল, সেই নিষেধাজ্ঞা আজও বহাল। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ দুই বছর ধরে দিল্লির ভাষায় এখনও ‘পরীক্ষাধীন।’ রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতও নতুন করে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। সর্বশেষ ১০ আগস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ আশা করছে নয়াদিল্লি ঢাকার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোনো স্তম্ভকে আন্ডারমাইন করার মতো কোনো কর্মকাণ্ড আর হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতেও বলা হয়, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার প্রত্যাশার কথাও বাংলাদেশ জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, ত্রিবেদী-তারেক বৈঠকটি মোটেও ভালো ছিল না মোদী প্রশাসনের জন্য। হাসিনা আমলে যেভাবে ভারত একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিত বাংলাদেশের ওপর, এবার তার উল্টোটা ঘটেছে। বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে এই বৈঠকে।
ত্রিবেদীকে জানানো হয়েছে- স্বৈরাচার হাসিনা ভারত থাকলে দিল্লীর মাটিতে পা রাখবেন না বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হাসিনাকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে।
ঢাকার অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছে সরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মনে করে, শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
গত ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। সরকারের বক্তব্য ছিল, দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামির এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে অবমাননার শামিল।
১০ আগস্ট হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো : নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা। বাংলাদেশের একটি যোগ্য আদালত শেখ হাসিনাকে দণ্ড দিয়েছে। তার কোনো বক্তব্য বা আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয় থাকলে সেটি আদালতের মাধ্যমেই উপস্থাপন করতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং ভারত সরকার তাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।
খলিলুর রহমান আরও বলেন, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনায় তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানকে আন্ডারমাইন করার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।
তবে দিল্লি সফরের প্রশ্নে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের আমন্ত্রণের প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ফলে আমন্ত্রণের ধরনকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্রিকস আমন্ত্রণের ধরণ ঘিরে অস্বস্তি
বিমসটেক- বঙ্গোপসাগরের তীর ঘিরে সাত দেশের একটা জোট, জন্ম ১৯৯৭ সালে ব্যাংককে। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার আর থাইল্যান্ড।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের মাধ্যমে আমন্ত্রণপত্রটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছায়।
তবে আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ না করে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আর এই ভাষাই কূটনৈতিক অস্বস্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
২০২৩ সালে জোহানেসবার্গের ব্রিকসে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পরিচয়ে, সদস্যপদ প্রার্থী অতিথি রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে। তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ হয়ে গেছে ‘বিমসটেকের চেয়ারপার্সন।’

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীন নৈশভোজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৩। সৌজন্যে: পিটিআই ফাইল ফটো
এ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়েও প্রশ্ন ওঠে। কেন আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় পদবি ব্যবহার করা হয়নি, জানতে চাইলে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তিনি বলেন, ব্রিকস সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে এবং আমন্ত্রণসহ কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।
ফলে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এবং সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের দাবি এবং তারেক রহমানকে আমন্ত্রণের ভাষা এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই কূটনৈতিক সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘ সফরেই এখন মূল প্রস্তুতি
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক সফরের প্রস্তুতির মূল কেন্দ্র জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন।
আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
প্রায় চার দশক পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে একজন বাংলাদেশি থাকছেন। একই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ভাষণ দেওয়ার বিষয়টিও তাই কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো না হলেও, দিল্লি সফরকে ঘিরে একটা বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং প্রত্যর্পণ ইস্যু ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে আছে। আর এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারতের মাটিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর কতটা বাস্তবসম্মত হবে, সেটিই এখন কূটনৈতিক মহলের বড়ো প্রশ্ন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা জামান বলেন, ৫ আগস্টের পর ভারত অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় অনেক চেষ্টা করেও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারেনি। তারা তখন বলেছিল, রাজনৈতিক সরকার আসলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সেটি এখনও করতে পারেনি ভারত। ভারতের সাথে অবশ্যই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে তবে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক দেওয়া শর্তসমূহ পূরণ করে তারপর।

' শর্তগুলো না মানলে আমি মনে করি উনি (প্রধানমন্ত্রী) ভারত যাবেন না । উনি গেলে বাংলাদেশের জনগণ এটাকে ভালো ভাবে নেবে না। এর চেয়ে উনি বরং সামনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকে বেশি গুরুত্ব দেবেন ।
‘র’ এর প্রধানের ঢাকা সফরের ব্যাপারে তিনি বলেন, আগেও এসব হতো তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে। এবার ডিজিএফআই’র প্রধান ভারত সফর করার কারণে ‘র’ এর প্রধানও আনুষ্ঠানিক সফর করেছেন।
এমএম/ইএফ
সাম্প্রতিক সংবাদ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের নয়, নিজের জুতা বহন করছিলেন সেই ওসি

জামায়াত ও আ.লীগ নিয়ে তারেক রহমানের ‘কথোপকথন’: অডিওটি এআই নির্মিত

ফের ভুয়া ফটোকার্ড পোস্ট করে গুজব ছড়ালেন সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা

৯ বছরের আগের ভিডিও ছড়িয়ে 'হাসিনা মারা যায়নি' দাবি আওয়ামীপন্থীদের

