প্রতিবেদন অনুযায়ী আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতনের সবচেয়ে বড় ধরন ছিল শারীরিক হামলা। ওই মাসে নথিভুক্ত ঘটনার ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল প্রত্যক্ষ হামলার ঘটনা।
বিএনপি সরকারের শেষ ৬২ দিন অর্থাৎ জুলাই ও আগস্ট মাসে ১১৭ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্যাতন, হামলা, আইনি হয়রানি ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। এ সময়ে এসব ঘটনায় মোট ৮৩টি পৃথক ঘটনা নথিভুক্ত করেছে মানবাধিকার ও গণমাধ্যম গবেষণা সংস্থা মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্ট (মিড)।
সংস্থাটির জুলাই ও আগস্টের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ও ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের সংখ্যা দুটিই বেড়েছে।
জুলাইয়ে ৩৯টি ঘটনায় ৫০ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। আগস্টে ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪টিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে হয় ৬৭ জন। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ঘটনা বেড়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ।
আগস্টে শারীরিক হামলা বেশি
প্রতিবেদন অনুযায়ী আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতনের সবচেয়ে বড় ধরন ছিল শারীরিক হামলা। ওই মাসে নথিভুক্ত ঘটনার ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল প্রত্যক্ষ হামলার ঘটনা।
রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং দুর্নীতির সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বেশি ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি ছিল প্রাণনাশের হুমকি। ওই মাসে নথিভুক্ত ঘটনার ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ, অর্থাৎ ১৯টি ঘটনায় সাংবাদিকরা প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়েন। সংবাদ প্রকাশ বা তথ্য সংগ্রহ বন্ধ রাখার জন্য এসব হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া গুলিবর্ষণ, হত্যাচেষ্টা, অপহরণ এবং মিথ্যা মামলার মতো হয়রানির ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে মিড। এর মধ্যে ১১ আগস্ট রাঙামাটিতে এক সাংবাদিককে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মফস্বল সাংবাদিকরাই বেশি ঝুঁকিতে
মিড এর পর্যবেক্ষণ বলছে, সাংবাদিক নির্যাতনের বড় অংশই ঘটেছে রাজধানীর বাইরে। জুলাইয়ে নথিভুক্ত ৩৯টি ঘটনার মধ্যে ৩২টি, অর্থাৎ প্রায় ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে।
আগস্টেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই মাসে ২৬টি জেলায় সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে একক শহর হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায় মোট ৯টি। এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের হামলায় একসঙ্গে পাঁচ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও রয়েছে।
স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রতিবেদনে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। আগস্টে নথিভুক্ত ঘটনার ২২ দশমিক ৭ শতাংশের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী, ভূমিদস্যু, অবৈধ বালু উত্তোলনকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও একাধিক ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। আগস্টের প্রায় ২৭ শতাংশ ঘটনায় বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের নাম এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১২ আগস্ট নাটোরের লালপুরে ছয় সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও এর মধ্যে রয়েছে।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিকদের হেনস্তা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে মিড।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক
আগস্টের উপাত্ত অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন প্রিন্ট মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক। তাদের হার ৫২ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর টেলিভিশনের সাংবাদিক ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
অধিকাংশ ঘটনায় নেই কার্যকর আইনি পদক্ষেপ
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হারও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগস্টে প্রায় ৩৯ শতাংশ ঘটনায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি।
জুলাইয়ে ১৮টি ঘটনায় জিডি করা হয়েছিল। আগস্টে জিডি করা হয় ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ ঘটনায়। তবে নিয়মিত মামলা হয়েছে খুব কম ঘটনায়। জুলাইয়ে মাত্র পাঁচটি ঘটনায় এবং আগস্টে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ঘটনায় নিয়মিত মামলা হয়েছে।
মিড এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংস্থাটি মনে করছে, বিশেষ করে মফস্বলের সাংবাদিকরা বর্তমানে নিরাপত্তার দিক থেকে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত নথিভুক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনগত ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের গণমাধ্যমের ওপর হামলা থেকে বিরত রাখার কার্যকর নির্দেশনা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।