বাংলাদেশ লেন্স

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের ২ লাখ কর্মী পাঠানোর দাবি নাকচ মালয়েশিয়ার

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর সাথে মালয়েশিয়ান হাই কমিশনারের বৈঠকের পর প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটির ব্যাপারে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী ও সরকারি মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল মিডিয়াকে বলেন,

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনারম্ভ, রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা বৃদ্ধি এবং বিনামূল্যে কর্মী পাঠানোর মতো ইতিবাচক সংবাদের মাঝেই তৈরি হয়েছে নতুন বিভ্রান্তি। বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ২ লাখ কর্মী নিয়োগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে নাকচ করে দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। তবে বাংলাদেশ সরকারের পূর্ববর্তী এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা ও অভিবাসন খরচ কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

৩০ আগস্ট (রোববার) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ সুহাদা ওসমানের এক সৌজন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠক শেষে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের জানান, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ থেকে ধাপে ধাপে ২ লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে; যা আগামী ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এছাড়া আরও ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে (জিরো কস্ট) মালয়েশিয়া নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

২ লাখ কর্মী নিয়োগের দাবি নাকচ

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর সাথে মালয়েশিয়ান হাই কমিশনারের বৈঠকের পর প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটির ব্যাপারে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী ও সরকারি মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল মিডিয়াকে বলেন,

"আমি বিষয়টি নিয়ে আমাদের মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা জানতে পেরেছি যে বক্তব্যটি বাংলাদেশের একজন প্রতি মন্ত্রী প্রদান করেছেন। এটি বাংলাদেশের সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা অবস্থান নয় এবং মালয়েশিয়া সরকারের ২ লাখ কর্মী নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।"

মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের এই স্পষ্টীকরণের মাধ্যমে ২ লাখ কর্মী পাঠানোর ঘোষণার বিষয়ে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

১৮ ও ২৮ আগস্টের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সফর ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হলেও, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ১৮ ও ২৮ আগস্টের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছে। গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বেশ কিছু বিষয় সামনে আসে।

১৮ আগস্টের প্রথম তালিকা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ

গত ১৮ আগস্ট মালয়েশিয়া সরকারের উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি (মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন) তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন প্রদান করে। তবে এতে সিন্ডিকেটের আশঙ্কায় বিতর্ক দেখা দিলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, প্রক্রিয়াটিকে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ও স্বচ্ছ করা হচ্ছে।

২৮ আগস্টের বিশেষ অর্জন (২৫ থেকে ৩৩৮ এজেন্সি)

বাংলাদেশের জোর কূটনৈতিক অনুরোধের প্রেক্ষিতে গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করে যে, পূর্বের সমঝোতা স্মারকের (MoU) আইনি সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়াকে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছে। মালয়েশিয়ার নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে 'অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি' হিসেবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল (BOESL)-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে মোট ৩৩৮টি এজেন্সি এখন স্বচ্ছভাবে কর্মী পাঠাতে পারবে, যা ফ্যাসিবাদী আমলের সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক পদক্ষপ।

বিনামূল্যে (জিরো কস্ট) ১০ হাজার কর্মী প্রেরণের অগ্রগতি

বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (জিরো কস্টে) নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। বোয়েসেল-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে এই কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে।

মেডিকেল সেন্টার ও নিরাপত্তা

বিতর্কিত ও অনিয়মে যুক্ত মেডিকেল সেন্টার বাদ দিয়ে প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত ১৬টি কেন্দ্র দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ এবং ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এবং কবে থেকে কর্মী পাঠানোর চূড়ান্ত আবেদন নেওয়া শুরু হবে, তা যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ বা বিজ্ঞপ্তি জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের কাছে টাকা দেওয়া, পাসপোর্ট জমা রাখা কিংবা মেডিকেল টেস্ট করা থেকে বিরত থাকার জন্য সর্বসাধারণকে আহ্বান জানানো হয়েছে।