তবে সংকট সবচেয়ে প্রকট কয়েকটি ব্যাংকে। একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ শুধু মুনাফা কমাচ্ছে না, মূলধন সক্ষমতা ও নতুন ঋণ দেওয়ার সামর্থ্যও দুর্বল করছে।
বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। অর্থাৎ এই ৩৩ টাকা আদায় হয় নি বা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। খেলাপি ঋণ ইস্যুতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগও যেভাবে ঋণখেলাপিদের সুযোগ করে দিয়েছিল, এই সরকারও একই কাজ করছে।
বাংলাদেশ ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে সারাবিশ্বে এখন এখন শীর্ষে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এবছর জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর আগে শীর্ষ স্থানে চিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশে।
এদিকে গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এবছর মার্চের শেষে এর পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তবে বর্তমান সংকটের পুরোটা সাম্প্রতিক সময়ের নয়। দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা ও ঋণ শ্রেণীকরণের শিথিলতার কারণে সমস্যাগ্রস্ত অনেক ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই ও তদারকি জোরদার হওয়ার পর সেই ঋণের একটি বড় অংশ এখন খেলাপি হিসেবে সামনে আসছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ যাচাই, বেনামি ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থায়ন, দুর্বল তদারকি এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসনের ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়িক মন্দা, বিনিয়োগের ধীরগতি ও জ্বালানি সংকট। ফলে পুরোনো খেলাপি ঋণের পাশাপাশি নতুন করে ঋণখেলাপির ঝুঁকিও বাড়ছে।
তবে সংকট সবচেয়ে প্রকট কয়েকটি ব্যাংকে। একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ শুধু মুনাফা কমাচ্ছে না, মূলধন সক্ষমতা ও নতুন ঋণ দেওয়ার সামর্থ্যও দুর্বল করছে।
বাংলাদেশে জন্য চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণের পরিমাণ নয়, বরং এর কতটা আদায় করা সম্ভব। বারবার পুনঃতফসিল বা হিসাবের শ্রেণি পরিবর্তন করে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণ কমানো গেলেও ব্যাংকের অর্থ ফেরত না এলে সংকট থেকে যায়। ঋণ আদায়, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
তবে ঋণ খেলাপির হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ না করতে পারা এবং সরকারগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, নেপালে খেলাপি ঋণ কম কারণ সেদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকার যা চায় তাই হয়। আর সরকার ঋণ খেলাপি তথা ব্যবসায়ীদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়। আওয়ামী লীগও তাই করেছিল। ফলে অদূর ভবিষ্যতে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা যায় না।
এমএম/আরএ/ইএফ