জুলাই সনদ কার্যকর হলে ‘কম্প্রোমাইজড ক্যান্ডিডেট’ হতেন কর্নেল অলি!

মঙ্গলবার সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার কার্যকর হলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘কম্প্রোমাইজড ক্যান্ডিডেট’ হতে পারতেন কর্নেল অলি আহমদ। ফলে প্রচলিত ধারায় সরকারি দল মনোনীত ব্যক্তিই যে রাষ্ট্রপতি হবেন, সেই ধারণা বদলে যেত। ফলে সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা মোটেই দলীয় প্রার্থীর নিশ্চিত জয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারত না। আর সেই সম্ভাব্য সমীকরণেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের জন্য তৈরি হতে পারত রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার পথ।
বর্তমান সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী এ নির্বাচন হয় প্রকাশ্য ভোটে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে আইনগত বিতর্ক থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়া এমপিদের জন্য বড় ঝুঁকির বিষয়। ফলে সংসদে যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেই দলের মনোনীত প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনাও থাকে বেশি।
এ প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।’ অন্যদিকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটা হওয়া উচিত ছিল। যেহেতু গণভোটের রায়ও সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেত। তাহলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হতেন।’
বর্তমান সংসদে বিএনপির রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সদস্য সংখ্যা ৯০। ফলে বর্তমান ব্যবস্থায় বিএনপির প্রার্থীর বিপক্ষে অলি আহমাদের জয় পাওয়া কঠিন।
কিন্তু জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকর হলে এখানেই বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি শুধু নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল না। প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষসহ আইনসভার উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনটি বড় পরিবর্তন আসত।
প্রথমত, নিম্নকক্ষের পাশাপাশি উচ্চকক্ষের সদস্যরাও ভোট দিতেন। দ্বিতীয়ত, ভোট হতো গোপন ব্যালটে। তৃতীয়ত, ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা মূলত অর্থবিল ও আস্থা ভোটের মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমিত রাখার প্রস্তাব ছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এই বাধ্যতামূলক ভোটের আওতায় না থাকায় একজন সংসদ সদস্য দলীয় প্রার্থীর বাইরে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ পেতেন। এখানেই অলি আহমাদের সম্ভাবনার মূল জায়গা।
এখানে মূলত, বিএনপির সংসদ সদস্যদের ভোট ব্যাংক ভাঙলেই বদলে যেতে পারত অঙ্ক। ধরা যাক, ১১ দলীয় জোটের ৯০ সদস্য অলি আহমাদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকলেন। একই সময়ে গোপন ভোট ও সীমিত ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে বিএনপির এমপিরা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেন। তাহলে বিএনপির বিপুল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন প্রার্থীর পক্ষে ভোটে রূপান্তরিত হতো না। বিএনপির ভোট একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে ১১ দলীয় জোটের ৯০ ভোটও আর শুধু বিরোধী জোটের ভোট হিসেবে থাকত না। বরং তা হয়ে উঠতে পারত একটি সম্ভাব্য বিজয়ী সমীকরণের ভিত্তি।
এখানে বিএনপির এমপিদের ভোট বিভাজনের বিষয়টি সব থেকে বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। কারণ জুলাই সনদের কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকত না। প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত।
ইতোমধ্যে বিএনপির ভেতরে একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার নাম রাষ্ট্রপতি পদে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। ড. আব্দুল মঈন খান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও প্রকাশ্য আলোচনায় ছিল। এছাড়াও মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও রুহুল কবির রিজভী। বলা যায় বিএনপির এই ৪ জন নেতা একই বলয়ে রাজনীতি করেন। অপর দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, জহির উদ্দিন স্বপন আরেকটি বলয়ের রাজনীতি করেন। এছাড়াও বিএনপিতে রয়েছে গ্রুপিং, উপদল। তবে তাঁদের প্রত্যেককে ঘিরে পৃথক ‘রাষ্ট্রপতি গ্রুপ’ সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।
তবু গোপন ভোটের পরিস্থিতিতে বিএনপির ভোট একক প্রার্থীর পেছনে না গিয়ে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে অলি আহমাদ দলীয় বিভাজনের বাইরে একটি ‘কম্প্রোমাইজ ক্যান্ডিডেট’ হিসেবে সামনে আসতে পারতেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অঙ্ক তখন আর শুধু ‘কার কতটি আসন’ এতে সীমাবদ্ধ থাকত না। বরং প্রশ্ন হতো কার পক্ষে কতজন সদস্য স্বাধীনভাবে ভোট দিচ্ছেন।
এদিকে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন কাঠামোয় ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব ছিল। নিম্নকক্ষের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো যে হারে ভোট পাবে, সেই অনুপাতের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধু নিম্নকক্ষে কোনো দলের আসনসংখ্যা দিয়ে পুরো হিসাব নির্ধারিত হতো না। উচ্চকক্ষের সদস্যদের ভোটও যুক্ত হতো। এতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচলিত সংখ্যাতত্ত্বে মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ছিল। কারণ মোট জাতীয় নির্বাচনে সরকারিদল ও বিরোধী দলের মোট ভোটের অনুপাত আর সংসদের নিম্নকক্ষে আসনের অনুপাত কিন্তু মোটেও এক নয়। মোট ভোট প্রাপ্তির অনুপাতে বিএনপি জোট ও ১১ দলীয় জোটের ভোটের অনুপাত ৪৯.৯৭% ও ৩৮.৫২%। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে ১১ দলীয় জোট উচ্চকক্ষে নিম্নকক্ষের অনুপাত অনুযায়ী বেশি আসন পেত।
তবে, গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এলেও প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো কার্যকর হওয়ার আগে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী। অর্থাৎ এবার উচ্চকক্ষের ভোট নেই, গোপন ব্যালট নেই এবং ৭০ অনুচ্ছেদের প্রস্তাবিত সীমিত কাঠামোও কার্যকর হয়নি। তাই ১১ দলীয় জোট অলি আহমাদকে প্রার্থী করলেও বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সামনে তাঁর পথ তাই কঠিন।
তারিক/ইএফ
সাম্প্রতিক সংবাদ

ভারতের ককরোচ আন্দোলনের ভিডিও ছড়িয়ে ‘ধানমন্ডি উত্তাল’ দাবি আওয়ামীপন্থীদের

প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর আপাতত স্থগিত

মওদুদীবিরোধী বলয়ে বিএনপির ভরসা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, চাপে জামায়াতের জোট

অতিথিদের ৩৩ শতাংশ বিএনপিপন্থী, জামায়াত ১২ শতাংশ, প্রায় অনুপস্থিত এনসিপি

