বাংলাদেশের মক্কা প্যাক্টে যুক্ত হওয়া নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া আতঙ্কিত কেন?

“মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা। পাকিস্তানকে ঘিরে যেকোনো সামরিক সমীকরণকে ভারত স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখে।’’
পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ২৪ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এই জোটে যেতে ঢাকার আগ্রহের কথা জানান। তিনি বলেছেন, "মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মিডল ইস্টে যদি এমনও হয় যে ইসলামিক নেশনসদের মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে তো আর অস্বাভাবিক না যাওয়া। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।'
এরপর থেকেই ভারতীয় গণমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল হৈচৈ। বিষয়টিকে ভারতের নিরাপত্তা হুমকি হিসাবে দেখিয়ে অনেক গণমাধ্যম শুরু করে নেতিবাচক প্রচারণা ও মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।
২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইন্ডিয়া টুডে মক্কা প্যাক্টকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে ভারতের ‘ইস্টার্ন ফ্ল্যাঙ্ক’-এর জন্য সম্ভাব্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কথিত ‘ইসলামিকরণ’-এর বিষয়টিও সামনে আনা হয়। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যে ধর্মীয় বার্তা এবং চার খলিফার নামে সামরিক ইউনিট গঠনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে দাবি করা হয়, এসব পরিবর্তনের ওপর ভারত নজর রাখছে।
একই দিনে ইন্ডিয়া টুডেতে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল দীপ্তাংশু চৌধুরীর একটি মতামত প্রকাশিত হয়। সেখানে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, বাংলাদেশ এই প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের কৌশলগত উপস্থিতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এ পাকিস্তানের গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ভারতের কৌশলগত প্রভাবও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মত দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে দিল্লিকে পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে মূল্যায়ন করতে হতে পারে বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
২৭ আগস্ট নভভারত টাইমসের একটি প্রতিবেদনে আরও একধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মক্কা প্যাক্ট নিয়ে কথিত প্রচারণার দাবি করা হয়। সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, ‘মক্কা চুক্তি জান্নাতের পথ খুলে দেবে’—এমন গুজব ছড়িয়ে সেনাসদস্যদের জোটটির প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। একই প্রতিবেদনে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানকে ‘ভারত থেকে তথাকথিত দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করা হয়, ৫ আগস্ট মক্কা প্যাক্টে যোগ দিয়ে ঢাকা দ্বিতীয় স্বাধীনতা উদযাপনের পরিকল্পনা করেছিল। তবে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধান পরাগ জৈন শেষ মুহূর্তে তারেক রহমানকে মক্কা সামরিক জোট ও সরকার পতনের কথিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘তারেককে শেষ মুহূর্তে আটকে দিল ভারত’।
২৮ আগস্ট, নভভারত টাইমস ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদনের রেফারেন্স দিয়ে ‘বাংলাদেশ কি ভারতের সাথে যুদ্ধ লড়বে? বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ মুসলিম ন্যাটো থেকে দূরে থাকার ৫টি কারণ ব্যাখ্যা করলেন’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ভারতীয় পাঠকদের সামনে একটি সতর্কতামূলক বয়ান তুলে ধরা হয়।
Aaj Tak Bangla-ও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে ভারতের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় চলে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ঘিরে বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতার সম্ভাবনা নিয়ে ভারতকে নতুন করে নিরাপত্তা হিসাব করতে হতে পারে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অতীত কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সামনে আনা হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, তুরস্ক ও পাকিস্তান আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ভারতের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারে। একই ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করে Aaj Tak Bangla। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাসকে ভারতবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উপস্থাপন করা হয়।
NDTV-তে ১৭ আগস্ট ‘Why a Bangladesh proposal by Turkish media should worry India’ শিরোনামে আদিতি ভাদুড়ির একটি মতামত প্রকাশিত হয়। এতে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ইয়েনি শাফাক-এ বাংলাদেশের মক্কা প্যাক্টে আগ্রহের বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সমালোচনা করা হয়। নিবন্ধে ইয়েনি শাফাককে ইসলামপন্থী সংবাদমাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তুরস্ক দেশটিকে এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
নিবন্ধটিতে তুরস্ককে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে তুরস্ক কৌশলগতভাবে লাভবান হতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য দিল্লিকে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
NDTV এর প্রতিবেদনে মক্কা প্যাক্টকে পাকিস্তানের উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, জোটটি ভবিষ্যতে ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং পাকিস্তান বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে তারেক রহমানের ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’ অবস্থানের সঙ্গেও তুলনা করা হয় এবং এটিকে পাকিস্তানের দিকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
NDTV এর ২১ আগস্ট প্রকাশিত আরেকটি ‘Bangladesh Keen to Join Saudi, Pak-Turkish Defence Alliance: Ex-PM Top Aide’ শিরোনামের প্রতিবেদনের শেষ প্যারায় বিশেষজ্ঞদের মতামত উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দেওয়ার চিন্তা ও একটি আনুষ্ঠানিক ডিফেন্স চুক্তি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো সম্পৃক্ততাকে ভারত সন্দেহের চোখে দেখবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, "অতীতে পাকিস্তান বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ছড়ানোর উদ্দেশ্যে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে"।
অন্যদিকে Hindustan Times-এর প্রতিবেদনে বলা হয় মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনার মুখে পড়তে পারে সরকার। একই সঙ্গে ভারত ও চীনের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাও ঢাকার জন্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
আজতক বাংলা এই ইস্যুতে একটা এনালাইসিসে উল্লেখ করে, যে পাকিস্তান এক সময় বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের হাত ধরে তৈরি হওয়া এক নতুন সামরিক জোটে কিনা যোগ দেওয়ার কথা ভাবছে বাংলাদেশ! বিশ্লেষণে এই জোটে যোগদানের কারণ হিসাবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর বৈদেশিক পরিবর্তিত নীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে দেখানো হয়েছে। আজ তাক বাংলা আরেকটি এনালাইসিসে পাকিস্তান বাংলাদেশের বর্ডার ব্যবহার করে ভারতে জিহাদি (ভারতীয় চ্যানেলের শব্দচয়ন অনুসারে জিহাদি বলতে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কে বোঝায়) প্রবেশ করাচ্ছে বলে অভিযোগ করে।
India Today Global তাদের এক এনালাইসিসে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া ভারতের জন্য মারাত্মক সামরিক ঝুঁকি হিসেবে দেখিয়েছে। কারণ হিসেবে দেখিয়েছে ভারতের পশ্চিমে পাকিস্তান ও পূর্বে বাংলাদেশের অবস্থান। চ্যানেলটি আশংকা করছে পশ্চিমে পাকিস্তান, পূর্বে বাংলাদেশ, সাথে চীনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং তুরস্ক ও সৌদি আরবের মতো বড় শক্তির অর্থ ও প্রযুক্তির সমীকরণ মিলিয়ে ভারতের চারপাশে একটি জটিল প্রতিরক্ষা বলয় বা কৌশলগত বেষ্টনী তৈরি হবে। তাছাড়া বাংলাদেশ যদি সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্যাক্টে বা এই জাতীয় ব্লকে আরও সক্রিয় হয়, তবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতি এবং ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তাছাড়া পাকিস্তানের সাথে সামরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠাকে ভারতের কূটনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
CNN NEWS 18 দক্ষিণ এশিয়ায় (মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মতো দেশে) ভারতের প্রভাব কমার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও এই ধরনের নতুন প্রতিরক্ষা জোট তৈরি হওয়াকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে ঠেকানোর চেষ্টা করে আসছিল বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে ভারতের প্রতিবেশী হওয়ায় এমন এক সামরিক জোটে যোগ দেওয়া যেখানে পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা নয়াদিল্লির নিরাপত্তার জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
Times Now তাদের এনালাইসিসে এই চুক্তিকে ভারতের অশনীসংকেত হিসেবে দেখছে। তাদের এনালাইসিসে বলা হয়, “বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান-ভিত্তিক এই জোটে যোগ দেয় এবং চীনা অস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়, তবে পশ্চিমের পর ভারতের পূর্ব সীমানাতেও সামরিক দিক থেকে ভারতকে একধরনের ঘেরাও বা নতুন কৌশলগত জটিলতার মুখে পড়তে হবে। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করা অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বাংলাদেশের খুব কাছে অবস্থিত । এছাড়া লালমনিরহাটের পুরোনো বিমানঘাঁটি সংস্কারে চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে ভারত চিন্তিত, যা চিকেনস নেক থেকে প্রায় ১৪০ কিমি দূরে অবস্থিত । চীনা যুদ্ধবিমান, রাডার ও ড্রোন প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বিদেশি ও চীনা টেকনিশিয়ানদের উপস্থিতি ভারতের আকাশসীমা ও নৌঘাঁটির নিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর উদ্বেগের কারণ হতে পারে।”
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
ভারতীয় মিডিয়ার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান।
তিনি বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা। পাকিস্তানকে ঘিরে যেকোনো সামরিক সমীকরণকে ভারত স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। তবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে পাকিস্তান জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটাতে পারে, ভারতীয় গণমাধ্যমের এমন আশঙ্কার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বরং আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকাণ্ড নির্দিষ্ট কাঠামো ও শর্তের মধ্যে আসে, ফলে জবাবদিহির জায়গাটিও আরও স্পষ্ট থাকে।”
তার মতে, শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’ নিয়ে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকতে পারে। কিন্তু সেই উদ্বেগের জায়গা থেকে সরে গিয়ে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে জঙ্গিবাদের আশঙ্কার মতো বিষয় সামনে আনা অনেকটাই অতিরঞ্জিত। কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে তখনই, যখন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে। তাই ভারতের উদ্বেগের যৌক্তিক কারণ রয়েছে, কিন্তু সেই ‘রাইট রিজন’ বাদ দিয়ে ‘রং রিজন’ সামনে আনা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভারতের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক মিত্র আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মক্কা চুক্তিতে অংশগ্রহণকেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব কৌশলগত ঝুঁকির পাশাপাশি অতিরঞ্জিত নিরাপত্তা আশঙ্কার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে।”
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক আবু রুশদ মো. শহিদুল ইসলাম বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাবে কি না, সেটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও হয়নি। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত। এর মূল কারণ হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পর থেকে উপমহাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে ছিল। তারা সবসময় চেয়েছে বাংলাদেশে তাদের পছন্দের একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকুক, যাতে বাংলাদেশ স্বতন্ত্রভাবে পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি অনুসরণ করতে না পারে। এখন বাংলাদেশ স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি অনুসরণ করছে, এটাই তাদের মূল মাথাব্যথা।”
তিনি আরও বলেন, “মক্কা চুক্তি ছাড়াও আমরা চীন থেকে যুদ্ধবিমান আনব, তিস্তা চুক্তি করব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করব কিনা এসব বিষয় নিয়েও ভারতের মাথাব্যথা দেখা যায়। অথচ বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র হলেও তার ভূকৌশলগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ এবং তার নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, আমাদের পাশে মূলত মুসলিম দেশগুলোই দাঁড়িয়েছে। সুতরাং নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশকে এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভারতের উদ্বেগ থাকতেই পারে, কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তে তাদের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকা উচিত নয়।”
সাম্প্রতিক সংবাদ

নিষিদ্ধ আ.লীগ-সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ মামলার মূল আসামি নোবেল এখনও ইত্তেফাকের সাংবাদিক!

ওয়াই-ফাই এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে মুফতি জয়নাল আবেদিন কাদেরী ও ডা. নাবিলের দাবিগুলো কতটা সত্য!

ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হামলা, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে চাপ

সময় টিভির আগস্ট মাসের ‘সম্পাদকীয়’ টকশোতে বিএনপির অতিথি ৩৬, জামায়াত ১৩, এনসিপি ১১

