যেভাবে বদলে গেল গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য
‘সিনিয়ররা একটু সালাম দেক এসে’ বদলে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’

ভিডিওতে নাহিদ ইসলামকে সালাম দিতে শেখানোর কোনো বক্তব্য নেই; গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘সিনিয়ররা একটু সালাম দেক এসে’। অথচ বিভিন্ন সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমে সেটিই ছড়িয়েছে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ হিসেবে।
১১ দলীয় জোটের একটি সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ বলেছেন, এমন দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দাবির ভিত্তিতে নাহিদ ইসলামকে ‘শিষ্টাচার শেখানো’ এবং তরুণ রাজনীতিকদের প্রতি গোলাম পরওয়ারের মনোভাব নিয়ে সমালোচনাও করেছেন অনেকেই।
৯ আগস্ট ১১ দলীয় জোটের সংবাদ সম্মেলনটি জামায়েতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি প্রচার করা হয়। লাইভ ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য ছিল ‘সিনিয়ররা একটু সালাম দিক এসে।’ অর্থাৎ তিনি নাহিদ ইসলামকে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ বলেননি। দুটি বাক্যের অর্থও সম্পূর্ণ ভিন্ন। মূল বক্তব্যে ‘সিনিয়ররা’ নিজেরাই কর্তা—তাদের এসে সালাম দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রচারিত বক্তব্যে নাহিদ ইসলামকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তাকে সিনিয়রদের সালাম দিতে বা সম্মান করতে শেখানো হচ্ছে।
ফলে এখানে শুধু একটি শব্দের ভুল নয়। বক্তব্যের কর্তা এবং পুরো অর্থই বদলে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরবর্তী পুরো প্রতিবেদনে মূল উদ্ধৃতি হিসেবে শুধু ‘সিনিয়ররা একটু সালাম দেক এসে’ ব্যবহার করা। আর ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ কথাটি শুধু সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত বিকৃত উদ্ধৃতি (ফটো বা ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশন) হিসেবে উল্লেখ করা।
কী ঘটেছিল সংবাদ সম্মেলনে
রোববার ৯ আগস্ট রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটির লাইভ ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রচার করে। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরের একটি কয়েক সেকেন্ডের অংশ কেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। আর মূল বিতর্কের সূত্রপাত সেখানেই। তবে মূল বক্তব্য আর প্রচারিত বক্তব্য এক নয়। ভিডিওতে গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য হলো, ‘সিনিয়ররা একটু সালাম দেক এসে।’ অন্যদিকে প্রচার করা হয়েছে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো।’ দুটি বাক্যের মধ্যে শুধু শব্দগত নয়, মৌলিক অর্থগত পার্থক্য রয়েছে।
‘সিনিয়ররা একটু সালাম দিক এসে’ কথাটিতে ‘সিনিয়ররা’ নিজেরাই কর্তা। অর্থাৎ কথা হচ্ছে উপস্থিত অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে। কিন্তু ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ বাক্যে নাহিদ ইসলামকে কর্তা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে অর্থ দাঁড়াচ্ছে, নাহিদ সিনিয়রদের সালাম দিতে জানেন না এবং গোলাম পরওয়ার তাঁকে শিষ্টাচার শেখাচ্ছেন। ফলে একটি পরিস্থিতিগত মন্তব্যকে বদলে ব্যক্তিগত ভর্ৎসনার বক্তব্যে পরিণত করা হয়েছে।
একাধিক পেজে একই ভুল ক্যাপশন: বেঙ্গল লেন্সের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভুল বা বিকৃত উদ্ধৃতিটি একটি পেজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। People's News ভিডিওটির শিরোনাম দিয়েছে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো, নাহিদকে গোলাম পরোয়ার!’ একই ভাষায় বৈশাখী টিভি, Daily Bangla Post-ও ভিডিও প্রকাশ করেছে। Xpress Bangla-তেও একই দাবি পাওয়া যায়। অন্য একটি পেজে লেখা হয়েছে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শিখো, নাহিদকে বললেন জামায়াত নেতা’। ইউটিউবের একটি শর্টস ভিডিওতেও একইভাবে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শিখো’ বলে বক্তব্যটি উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো বক্তব্যের সারমর্ম নিজের ভাষায় লেখা এবং সেটিকে সরাসরি উদ্ধৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়। কিন্তু এসব পোস্টে বক্তব্যটি এমনভাবে শিরোনাম করা হয়েছে, যাতে দর্শকের কাছে মনে হয় গোলাম পরওয়ার ঠিক ওই কথাগুলোই বলেছেন।
পুরোনো ‘বাপের সঙ্গে পাল্লা’ বক্তব্য জুড়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে বয়ান: বিতর্কটি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মিয়া গোলাম পরওয়ারের একটি পুরোনো বক্তব্যও ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালে এনসিপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা ছাত্রদের নতুন দল। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে তোমাদের আরও বহুদূর যেতে হবে। জন্ম নিয়েই বাপের সঙ্গে পাল্লা দিও না।’ সেই মন্তব্যটি তখন ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ফলে নতুন করে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ উদ্ধৃতিটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে দুটি বক্তব্য পাশাপাশি রেখে গোলাম পরওয়ার তরুণ নেতাদের ‘তুচ্ছতাচ্ছিল্য’ করছেন- এমন একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেন। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আগের ‘বাপের সঙ্গে পাল্লা দিও না’ বক্তব্যটি তাঁর প্রকৃত বক্তব্য হিসেবে সংবাদমাধ্যমে নথিবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান ঘটনায় ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ কথাটি ভিডিওর সঙ্গে মেলে না। এ কারণে পুরোনো বক্তব্যকে বর্তমান ভুল উদ্ধৃতির সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই।
ক্লিপ সত্য, কিন্তু ক্যাপশন বদলে দিয়েছে অর্থ: এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে প্রচারিত ভিডিওটি ভুয়া নয়। ভিডিওতে মিয়া গোলাম পরওয়ার ও নাহিদ ইসলাম দুজনকেই দেখা যায় এবং গোলাম পরওয়ার সত্যিই কিছু বলেন। বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে ভিডিওর সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশন ও উদ্ধৃতিতে। এ ধরনের অপতথ্য শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন। কারণ দর্শক যখন একটি আসল ভিডিওর ওপর পরিচিত সংবাদ পেজের লেখা ক্যাপশন দেখেন, তখন ক্যাপশনটিকেই বক্তব্যের নির্ভুল ট্রান্সক্রিপশন হিসেবে ধরে নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ঘটনাতেও দৃশ্যত সেটিই ঘটেছে।
যাচাইয়ে যা পাওয়া গেল: বেঙ্গল লেন্সের হাতে থাকা ভিডিও ক্লিপ, অনুষ্ঠানটির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য ছিল ‘এবার... সিনিয়ররা একটু সালাম দিক এসে।’ অথচ সেটিকে প্রচার করা হয়েছে ‘সিনিয়রদের সালাম দিতে শেখো’ হিসেবে। সুতরাং ‘গোলাম পরওয়ার নাহিদ ইসলামকে সিনিয়রদের সালাম দিতে শিখতে বলেছেন’, দাবিটি বিভ্রান্তিকর এবং মূল বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই ব্যাপারে জামায়াতের মিডিয়া উইং এর মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় বেঙ্গল লেন্সের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেভাবে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ারকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে সেটা আসলেই দুঃখজনক । তিনি (গোলাম পরওয়ার) নাহিদের বক্তব্য শেষে বলেছেন, সিনিয়রা একটু সালাম দেক এসে। যা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা গণমাধ্যমকে আরো দায়িত্বশীল ভাবে সংবাদ পরিবেশন করার আহবান জানাচ্ছি।
বিষয়টি নিয়ে এনসিপির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য ইয়াসির আরাফাত বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুলবুঝাবুঝি হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির অভ্যন্তরীন গ্রুপে এটা নিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপির পক্ষে থেকে দলটির নেতাকর্মীদের ইতোমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে। ঘটনার দিন এনসিপির অভ্যন্তরীন গ্রুপে রাজনৈতিক পরষদের সদস্য সরওয়ার তুষার একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠান যেখানে তিনি জানান- ‘আহ্বায়কের ভাষ্যমতে গোলাম পরওয়ার জামায়াতের আমির ও কর্নেল অলিকে ডেকে আনার কথা বলছিলেন। প্রেস মিটে তাদের আসার কথা। সালাম দিয়ে আসো কথাটা ওইভাবেই আসছে৷ এটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইস্যু না করতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।’
এমএম/আরএ/ইএফ
সাম্প্রতিক সংবাদ

জামায়াত ও আ.লীগ নিয়ে তারেক রহমানের ‘কথোপকথন’: অডিওটি এআই নির্মিত

ফের ভুয়া ফটোকার্ড পোস্ট করে গুজব ছড়ালেন সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা

৯ বছরের আগের ভিডিও ছড়িয়ে 'হাসিনা মারা যায়নি' দাবি আওয়ামীপন্থীদের

ফ্যাক্ট-চেকের নামে বিভ্রান্তি, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল

