কার্যবিবরণীটি প্রাথমিক স্বাক্ষর করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমিক-২ সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার। তিনি নথিটি স্বাক্ষর করেছেন বলে জানিয়েছেন।
বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির হাতেই দিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিষয়টি সঠিক নয় দাবি করে শিক্ষা মন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেছেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের খবর অসত্য। এ বিষয়ে আলোচনা হলেও এরকম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নি। তবে বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে দেখেছে, স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের খবরটি গুজব নয়। বরং মন্ত্রী নিজেই এর প্রস্তাব করেছিলেন। ৩ আগস্ট এক সভায় এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে।
১০ আগস্ট (সোমবার) এনটিআরসিএর বদলে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক বেসকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠোনের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে। দেখুন এখানে এখানে ও এখানে ।
পরে বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনা হলে শিক্ষা মন্ত্রী এহসানুল হক মিলন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক একাউন্টে এটিকে গুজব বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA) ২০০৫ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। NTRCA এর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দরভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পর্যালোচনা অব্যাহত রেখেছে। ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ প্রদান সংক্রান্ত কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো অপতথ্য প্রচার না করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ রইল।’
মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে স্টার নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি কলেজে শিক্ষক নিয়োগের প্রচলিত নিয়ম বহাল রয়েছে এবং নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো সভা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের তথ্য ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’।
এ বিষয়ে গত ৩ আগস্ট শিক্ষা সচিবের সভাপতিত্বে এ সংক্রান্ত একটি বৈঠকের কার্যবিবরণী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে। নথিটি যাচাই করে সঠিক হিসেবে পেয়েছে বেঙ্গল লেন্স। নথিটির স্মারক, প্রস্তুতকারী, মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও স্বাক্ষরকারী এসব বিশ্লেষণ করে নথিটি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর হওয়ার হওয়ার কোনো প্রমাণ মেলে নি। বরং প্রত্যেকভাবেই এটিকে আসল হিসেবে পাওয়া গেছে।
কার্যবিবরণীটি প্রাথমিক স্বাক্ষর করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমিক-২ সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার। তিনি নথিটি স্বাক্ষর করেছেন বলে জানিয়েছেন।
মন্ত্রীর প্রস্তাবেই এই সিদ্ধান্ত
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখের সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও উপস্থিত ছিলেন। নথিটি ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত হয়।
সভায় শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলেন, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত এনটিআরসিএ মূলত নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করত। ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসিএর সক্ষমতার বাইরে গিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করার পর বিভিন্ন জটিলতা, মামলা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মত দেন।
এরপর তিনি এনটিআরসিএকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রত্যয়নপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কার্যবিবরণীতে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, ‘সভায় উপস্থিত সকলে এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।’
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের ১(ক) ধারায় বলা হয়েছে, এনটিআরসিএ এখন থেকে কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম করবে এবং ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী নিয়োগ সুপারিশ করবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ১(গ) ধারাটি। সেখানে বলা হয়েছে, ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জন তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বউদ্যোগে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ পাবেন। এ জন্য প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন বা জারি করার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ ‘কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি’ বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং সরকারি সভার কার্যবিবরণীতে এ ধরনের সিদ্ধান্তের অস্তিত্ব স্পষ্ট।
সিদ্ধান্ত হয়েছে তবে কার্যকর হবে প্রশাসনিক অনুমোদনের পর
এখানে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। ৩ আগস্টের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তটি তখনও চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট আদেশ, পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষায় ছিল। কার্যবিবরণীর ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সভার সিদ্ধান্তগুলোর প্রশাসনিক অনুমোদনের পর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আদেশ জারি করা হবে।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিক এ বিষয়ে মন্ত্রী ও সচিবের সাথে কথা বলতে বলেন । এ নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হন নি।
মন্ত্রী ও সচিবের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে কল দিয়ে পাওয়া যায় নি।
এমএম/আরএ/ইএফ