ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাসনাতের আত্মসমর্পণ ও আওয়ামী লীগের ফিরে আসার উপযোগিতা

একই সপ্তাহে কিশোরগঞ্জে ব্যান্ড কনসার্ট স্থগিত হয়— ইমাম-উলামা পরিষদের স্মারকলিপির পরদিন। যদিও প্রশাসন কারণ দেখায় হোটেল-নিবন্ধনের আইনি জটিলতা।
১৯ আগস্ট, রাত সাড়ে ১১টা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসে জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। পাশেই দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসা। কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রধান ফটকের পকেট গেট দিয়ে ঢোকেন, ভেতরে চেয়ার ভাঙেন। পুলিশ লাঠিপেটা করে। জবাবে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। রাত শেষ হওয়ার আগেই দুই পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত।
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমান তিনটি দাবি তোলেন— কনসার্ট বন্ধ, দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত, আহত ছাত্রদের চিকিৎসা। পুলিশ সুপার তিন কর্মকর্তা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেন। ভোর হওয়ার আগেই দাবি মেনে নেওয়া হয় (প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট)।
আলাদা করে দেখলে এটা একটা জেলা শহরের একটা সংঘর্ষের খবর। কিন্তু এটা কেবলই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না।
একই সপ্তাহে কিশোরগঞ্জে ব্যান্ড কনসার্ট স্থগিত হয়— ইমাম-উলামা পরিষদের স্মারকলিপির পরদিন। যদিও প্রশাসন কারণ দেখায় হোটেল-নিবন্ধনের আইনি জটিলতা।
২২ আগস্ট সিলেটের বিয়ানীবাজারে "তৌহিদি জনতা" ব্যানারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি ওঠে। ২৬ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঈদে মিলাদুন্নবীর জশনে জুলুসে প্রশাসন অনুমতি দেয়নি; কওমি শিক্ষার্থীরা লাঠি হাতে শহরের মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেন, সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন (ঢাকা পেপারস, ২৬ আগস্ট)।
চারটি ঘটনার কারণ এক নয়। সিলেটের ইউএনও নিজেই বলেছেন, নৌকাবাইচ ঘিরে প্রায় প্রতি বছর মারামারি হয়, ফসলের ক্ষতি হয়, গত বছরও সে কারণে বাইচ হয়নি। কিশোরগঞ্জে কাগজে-কলমে কারণটা নিবন্ধনের। এগুলোকে এক সুতোয় গাঁথা সরলীকরণ।
তবু একটা মিল থেকে যায়। চারটি ক্ষেত্রেই যারা আয়োজন করতে চেয়েছিল তারা নয় বরং যারা বাধা দিয়েছিল তাদের অবস্থানই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে।
এই প্যাটার্নের মাঝখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেন, "ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এ রকম যে গানবাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো আরকি। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা" (ইত্তেফাক)।
বাক্যটাকে বলছেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে কক্সবাজার-১ থেকে জয়ী হন; সেই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি, আর পাঁচ দিনের মাথায় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন। অর্থাৎ যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিষেধাজ্ঞাকে এলাকার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বলে বর্ণনা করছেন, তিনি নিরপেক্ষ প্রশাসক নন — ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারক পরিসরের লোক।
একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ আইন প্রয়োগ করা। তিনি বর্ণনা করছেন কেন আইন প্রয়োগ করা যায় না।
এই মন্তব্যের একটা রাজনৈতিক পটভূমি আছে।
নির্বাচনের আগে, ৬ ফেব্রুয়ারি, হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ফটিকছড়ির এক মাহফিলে প্রকাশ্যে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়ান। চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের সমর্থনে বলেন, "আমি ইলেকশন বুঝি না, এটা একটি জিহাদ।" একই বক্তব্যে জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন, তারা প্রকৃত ইসলামী দল নয় (যুগান্তর, ৬ ফেব্রুয়ারি)।
ছয় মাস পর, ১০ আগস্ট, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ি গিয়ে বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নির্বাচনের সময় হেফাজত যেভাবে বিএনপির পাশে ছিল, ভবিষ্যতেও সেভাবে থাকার আহ্বান জানান তিনি (যুগান্তর, ১০ আগস্ট)। এই সফরের নয় দিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা।
একটা নির্বাচনী সমর্থন, একটা কৃতজ্ঞতা সফর, তারপর একজন মন্ত্রীর মন্তব্য যা বাধাদানকারী পক্ষকেই স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ নয় — সরাসরি নির্দেশনার কোনো নথি নেই, থাকার কথাও নয়। কিন্তু কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
তবে এটাকে হেফাজতের নিঃশর্ত আনুগত্য ভাবলে ভুল হবে।
১৭ জুলাই বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমিরের সভাপতিত্বে সাতটি কওমিভিত্তিক নিবন্ধিত দলের বৈঠক হয় — জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনসহ কয়েকটি। দলগুলোকে ৩ আগস্টের মধ্যে জামায়াত ও বিএনপির জোট ছাড়ার প্রশ্নে লিখিত মতামত জমা দিতে বলা হয়, একটি পৃথক কওমি প্ল্যাটফর্ম গঠনের লক্ষ্যে (খবরসংযোগ, ১৭ জুলাই)।
২১ আগস্ট বিএনপির এমপি শামীম কায়সার লিংকন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই হেফাজত বিবৃতি দিয়ে এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানায় । আট দিন পর, ২৯ আগস্ট, সেই প্রতিমন্ত্রীই বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে আমিরের দোয়া নেন। সাংবাদিকদের বলেন, হেফাজতের সমালোচনাকে তিনি "পরামর্শ" হিসেবে দেখেন, আর সরকারের ওপর এ ধরনের চাপ "গঠনমূলক"।
হেফাজত বিএনপির হাতের পুতুল নয়। নিজস্ব দাবি আছে, আপত্তি আছে, বিকল্প জোট গড়ার চেষ্টা আছে।
এই কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে ২৭ আগস্ট সংসদে সম্পূরক প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। জানতে চান, ছয় মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফেরাতে পেরেছেন কি না। যুক্তি হিসেবে বলেন, "ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নৌকাবাইচও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।“
সমস্যা হলো, নৌকাবাইচের ঘটনা সিলেটের, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নয়।
প্রশ্নটার লক্ষ্য ছিল সরকার। ভুলটা ছিল ভূগোলে। কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াল ভুলটাই।
২৮ আগস্ট রাত পৌনে ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৫০-২০০ জনের একটি মিছিল বের হয়, শেষ হয় প্রেসক্লাবের সামনে। কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে। দাবি — প্রকাশ্য ক্ষমা, নইলে পরদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির সাংগঠনিক সভা হতে দেওয়া হবে না। সেই সভায় থাকার কথা ছিল দলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমেরও। ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে হাসনাত ক্ষমা চান।
২৯ আগস্টের ফেসবুক পোস্টে তিনি দুটো আলাদা কাজ করেন।
প্রথমত, ভুল স্বীকার করেন — সিলেটের জায়গায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে ফেলায়। দ্বিতীয়ত, মূল ঘটনার একটা পাল্টা বয়ান দেন: ছাত্ররা কনসার্ট বন্ধ করেনি, রাতে পরীক্ষার্থীদের পড়ায় ব্যাঘাত হচ্ছিল বলে শব্দ কমাতে বলেছিল; বাদানুবাদ থেকে ঘটনা ঘটে, আর পুলিশের লাঠিপেটাতেই ছাত্ররা আহত হন।
এই বয়ান প্রথম আলোর প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলে না, যেখানে বলা হয়েছে ছাত্ররা ভেতরে ঢুকে চেয়ার ভাঙচুর করেছিল। কোনটা সঠিক, তার স্বাধীন যাচাই এই লেখায় নেই। তবে হাসনাতের যুক্তির কাঠামোটা লক্ষণীয় — তিনি বলছেন, ঘটনা যদি নিছক শব্দ নিয়ে বিরোধ হয়ে থাকে, তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর "নিষিদ্ধের মতো" কথাটাই ভুল, আর সেই ভুলটাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষকে ছোট করেছে।
সঙ্গে তিনি নীতিগত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন — "এই বাংলাদেশে মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে, সঙ্গীত থাকবে, ওয়াজ থাকবে... যার যেটা পছন্দ হবে না, সে সেটায় যাবে না।"
তথ্যে নতি স্বীকার, নীতিতে নয়।
এই আংশিকতাটা এলোমেলো নয়। রাজনীতিবিজ্ঞানে "অডিয়েন্স কস্ট" নামে একটা ধারণা আছে (জেমস ফিয়ারন, ১৯৯৪) — প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার পর পিছু হটলে নেতাকে দাম দিতে হয় নিজের সমর্থকদের কাছে, প্রতিপক্ষের কাছে নয়। ফলে চাপে পড়া নেতার সামনে সবচেয়ে সস্তা পথ হলো এমন কিছুতে ছাড় দেওয়া যা যাচাইযোগ্য ও নির্দিষ্ট, অথচ যার সঙ্গে দলের পরিচয় জড়িত নয়। একটা ভৌগোলিক ভুল ঠিক সেই জিনিস — স্বীকার করলে বিশ্বাসযোগ্যতা যায় না, কিন্তু বিরোধী পক্ষকে দেওয়ার মতো একটা জিনিস হাতে থাকে।
উল্টোদিকে "গানও থাকবে, ওয়াজও থাকবে" — এই বাক্য ছেড়ে দিলে জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে এনসিপির নিজস্ব দাবিটাই ফাঁকা হয়ে যায়। তাই ছাড় গেছে তথ্যে, নীতিতে নয়। শিরোনামের "আত্মসমর্পণ" শব্দটা এখানে পুরোপুরি খাটে না — খাটে যেটা, তা হলো সময়ের হিসাব। প্রশ্ন তোলা থেকে ক্ষমা চাওয়া পর্যন্ত লেগেছে ৪৮ ঘণ্টারও কম।
ক্ষমা চাওয়ার পর কওমি ঘরানার কিছু ফেসবুক পোস্টে আক্রমণের লক্ষ্য হয় ওই বহুত্ববাদী অংশটাই। একটি পোস্টে লেখা হয়, রাষ্ট্র সেক্যুলার হয়ে যাওয়ায় "আমর বিল মারুফ নাহী আনিল মুনকার" পালন করা যাচ্ছে না, আর হাসনাতের ক্ষমা চাওয়ার পোস্টও "অকাট্যভাবে কু/ফরে আক্রান্ত।" লেখক সরাসরি তাকফির করা থেকে বিরত থাকেন, উলামাদের এখতিয়ারের কথা তুলে — কিন্তু ভাষাটা দ্ব্যর্থহীন।
অর্থাৎ যেটা নিয়ে আপত্তি, সেটা আর ভৌগোলিক ভুল নয়। আপত্তিটা "গানও থাকবে, ওয়াজও থাকবে" — এই বাক্যটা নিয়েই।
তুলনাটা এখানে নিজে থেকেই উঠে দাঁড়ায়। হেফাজতের আপত্তির মুখে পড়া বিএনপির প্রতিমন্ত্রী আট দিনে সমঝোতা সেরে ফেলেছেন। ক্ষমা চাওয়া বিরোধী দলের এমপির পিছু আক্রমণ ছাড়েনি। পার্থক্যটা যুক্তির নয়, অবস্থানের।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক আবু সাইদ জশনে জুলুসের অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে বলেন, জেলার শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া। অথচ কওমি ছাত্ররা আগে থেকেই লাঠি হাতে অবস্থান নিয়েছিল — এটা প্রশাসন নিজেই জানত।
প্রথম আলোর এক মতামত কলামে এর বিপরীত একটা নজির টানা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জয়পুরহাটে ভাঙচুরের পর নারীদের ফুটবল ম্যাচ বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্দেশ আসে ম্যাচ ফের আয়োজনের; গণশুনানি হয়, ভাঙচুরকারীরা আর বাধা না দেওয়ার কথা জানান, শেষে হাজারো দর্শকের সামনে খেলা হয়। কলামিস্টের যুক্তি — রাষ্ট্র সক্রিয় হলে দমন-পীড়ন ছাড়াই এসব আয়োজন রক্ষা করা যায়।
তুলনাটার একটা সীমা আছে: দুটো ভিন্ন সরকার, ভিন্ন সময়, ভিন্ন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। প্রশাসনিক সক্ষমতার ফারাক নাকি রাজনৈতিক ইচ্ছার ফারাক, বাইরে থেকে তা আলাদা করা কঠিন। তবু নজিরটা দেখায়, ২০২৬ সালের সিদ্ধান্তটা একমাত্র সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত ছিল না।
২৮ আগস্ট রাতের মিছিলটা যে মাদ্রাসা থেকে বেরিয়েছিল — জামিয়া ইউনুসিয়া — সেই নামটা এই শহরের রাজনীতিতে নতুন নয়।
২০০১ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট ফতোয়া প্রদানকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। রায়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়, শীর্ষস্থানীয় আলেমরা গ্রেপ্তার হন। সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষটা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন — দাবি ছিল নেতাদের মুক্তি, এনজিও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, আর ফতোয়া-রায় বাতিল। দাঙ্গা পুলিশ ও বিডিআর গুলি চালায়। নিহত হন অন্তত ছয়জন, আহত একশোর বেশি; বেসরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা নয় পর্যন্ত বলা হয়েছিল (গালফ নিউজ, ২০০১)। ঢাকায় একই আন্দোলনে আরও তিনজন নিহত হন।
আট মাস পর অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে হারে। ফতোয়া-বিরোধী রায় আর এনজিও-বিতর্ক সেই পরাজয়ের কারণ ছিল কি না, তার কোনো নির্ভরযোগ্য মীমাংসা নেই — নির্বাচনী পরাজয়ের কারণ একটামাত্র ইস্যুতে খোঁজা প্রায় সবসময়ই ভুল। কিন্তু ক্রমটা রাজনীতিবিদদের স্মৃতিতে থেকে যায়, আর স্মৃতিটাই আচরণ নির্ধারণ করে।
দ্বিতীয় বড় ঘটনাটা ২০২১ সালের মার্চে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত পাঁচজন নিহত হন — হাসপাতালের চিকিৎসক রয়টার্সকে বলেছিলেন, তিনজনের মরদেহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এসেছিল, বাকি দুজন পরে মারা যান (আল জাজিরা, ২৭ মার্চ ২০২১)। আগের দিন চট্টগ্রামে নিহত হন হেফাজতের অন্তত চার সমর্থক। দেশজুড়ে মোট নিহতের সংখ্যা আরও বেশি।
দুটো ঘটনাই একই শহরে, দুই দশকের ব্যবধানে। দুটোতেই গুলি চালিয়েছে রাষ্ট্র, মরেছে ছাত্র-জনতা।
এর একটা ফল আছে যা রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে। এই শহরের ছাত্র-জনতার মধ্যে একধরনের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আত্মপরিচয় তৈরি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতাটা প্রধানত সংঘাতের — আলোচনার নয়। ২০২৬ সালের আগস্টে সংসদে যখন তাদের জেলার নাম উচ্চারিত হয় একটা নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে, প্রতিক্রিয়াটা সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই আসে।
এটা প্রতিক্রিয়াটাকে সঠিক প্রমাণ করে না। কিন্তু ব্যাখ্যা করে কেন একটা ভৌগোলিক ভুল এত দ্রুত এত বড় হয়ে উঠল। যে জেলার মানুষ দুই দশক ধরে "মৌলবাদী এলাকা" তকমা নিয়ে বাস করছে, তার কাছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর "ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা" আর সংসদে জেলার নাম ভুলভাবে উচ্চারিত হওয়া — দুটোই একই তকমার ধারাবাহিকতা হিসেবে পড়া যায়।
হাসনাত নিজেও ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন তাঁর পোস্টে — স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী "ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষকে ছোট করেছেন", তাঁদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। অভিযোগটা তিনি করেছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু জেলার নাম ভুলভাবে ব্যবহার করে তিনি নিজেকেও সেই একই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলেন।
এতক্ষণের বর্ণনায় একটা অনুচ্চারিত ধারণা কাজ করছে — হেফাজতের সমর্থন বিএনপির জন্য ভোটের হিসাবে মূল্যবান। এই ধারণাটা পরীক্ষা করা দরকার, আর পরীক্ষার তথ্যটা এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেই।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন ছেড়ে দিয়েছিল হেফাজত-ঘনিষ্ঠ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে। দলটির প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব। তিনি পান ৩২ হাজার ৫৭৯ ভোট। জেতেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা — ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট নিয়ে (প্রথম আলো, ১৩ ফেব্রুয়ারি; যুগান্তর)।
প্রায় চারগুণ ব্যবধান। সেই জেলায়, যাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী "অন্যরকম" বলে বর্ণনা করেছেন।
জমিয়ত সারা দেশে জোটের হয়ে ঠিক কয়টি আসনে লড়েছিল ও কয়টিতে জিতেছিল, তার পূর্ণ হিসাব এই লেখায় নেই; একটি সূত্র বলছে সমঝোতা হয়েছিল চার আসনে। কিন্তু এই একটা ফলাফলই একটা প্রশ্ন তোলে: ভোটের বাজারে যদি এই ঘরানার টান এতটাই সীমিত হয়, তাহলে বিএনপির কাছে হেফাজতের মূল্যটা কীসের?
দুটো ব্যাখ্যা সম্ভব। এক, মূল্যটা ব্যালটে নয় — রাস্তায়। কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ বা তৌহিদি জনতার ক্ষমতা ভোট গণনায় নয়, ভোটের বাইরের সময়ে শহরের মোড় দখল করায়, অনুষ্ঠান বন্ধ করায়, প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করায়। দুই, সম্পর্কটা হিসাব-নিকাশের নয় মোটেই, বরং পুরনো জোট-রাজনীতির জড়তা, যার ব্যাখ্যা ভোটের অঙ্কে হয় না।
তৃতীয় একটা সম্ভাবনাও আছে, আর সেটা সবচেয়ে অস্বস্তিকর — চাপটা যতটা মনে হয়, ততটা নয়।
অর্থনীতিবিদ তৈমুর কুরান এই ব্যবধানকে বলেছেন ‘প্রেফারেন্স ফলসিফিকেশন’ (১৯৯৫)। মানুষ প্রকাশ্যে যা বলে আর ব্যক্তিগতভাবে যা মনে করে, তার মধ্যে ফারাক থাকে, বিশেষত যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের সামাজিক মূল্য বেশি। এর একটা ফল হলো, সংগঠিত ও সরব সংখ্যালঘুকে প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে ভ্রম হয়। রাস্তার দৃশ্যমানতা আর ব্যালটের সংখ্যা তখন দুটো আলাদা জিনিস হয়ে দাঁড়ায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তথ্য এই ব্যাখ্যার সঙ্গে খাপ খায়। মধ্যরাতে দেড়শো-দুইশো জনের মিছিল একটা জাতীয় দলের সাংগঠনিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিতে পেরেছে। ছয় মাস আগে সেই একই জেলায় এই ঘরানার প্রার্থী হেরেছেন প্রায় চারগুণ ব্যবধানে। দুটো সংখ্যা একই জনপদের।
প্রশ্নটা তাই এনসিপির দিকেও ফেরে। যে হুমকির মুখে দলটির নেতারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মিটমাট করতে ছুটলেন, সেই হুমকির নির্বাচনী ওজন কতটা ছিল — এই ফলাফল তার সরাসরি উত্তর দেয় না। কিন্তু একটা সম্ভাবনা খোলা রাখে: চাপের কাছে নতি স্বীকারটা চাপের প্রকৃত মাপ যাচাই না করেই ঘটে থাকতে পারে।
মধ্যবিত্তের ভোট আলাদা করে মাপার তথ্য নেই। যা আছে তা জাতীয় ফলাফল, যাতে সব শ্রেণী মেশানো — বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ, জামায়াত ৩১.৭৬ শতাংশ (নির্বাচন কমিশন)। এই সংখ্যা থেকে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর আচরণ বলা যায় না।
তবু একটা ব্যাখ্যা প্রচলিত: জামায়াতের রক্ষণশীল রাজনীতির বিপরীতে মধ্যবিত্ত ভোটার বিএনপিকে তুলনামূলক উদার বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। এটা যুক্তি, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।
বিপরীত তথ্যও আছে। বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের নির্বাচনপূর্ব যুব সমীক্ষা বিশ্লেষণ করে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান দেখান, আওয়ামী লীগের একাংশ ভোটার বরং জামায়াতের দিকে সরেছিল — স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির প্রতিশোধমূলক মনোভাবের কারণে জামায়াতকে তাদের কাছে তুলনায় কম খারাপ মনে হয়েছিল । ভোট সবসময় একরৈখিক উদার বনাম রক্ষণশীল ছকে ধরা পড়ে না।
তবু যুক্তিটা বাতিল করার কারণ নেই, আর তিনটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা এখানে কাজে লাগে।
প্রথমটা নেগেটিভ পার্টিজানশিপ (আব্রামোভিৎজ ও ওয়েবস্টার, ২০১৬) — ভোটার প্রায়ই কোনো দলকে পছন্দ করে নয়, বরং প্রতিপক্ষকে অপছন্দ করেই ভোট দেয়। এই ধরনের সমর্থন অগভীর, শর্তসাপেক্ষ, প্রথম বড় হতাশাতেই আলগা হয়ে যায়।
হতাশার উপাদান হাজির। যে ভোটার জামায়াতের রক্ষণশীলতা এড়াতে বিএনপিকে বেছেছে বলে ধরা হচ্ছে, সে দেখছে সরকারের প্রতিমন্ত্রী হেফাজতের কাছে দোয়া নিতে যাচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী কৃতজ্ঞতা জানাতে ফটিকছড়ি যাচ্ছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কনসার্ট নিষিদ্ধ হওয়াকে এলাকার বৈশিষ্ট্য বলছেন।
দ্বিতীয় ধারণাটা আলবার্ট হার্শম্যানের — এক্সিট, ভয়েস অ্যান্ড লয়্যালটি (১৯৭০)। প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়িষ্ণুতায় সদস্যের সামনে তিনটে পথ: প্রতিবাদ, প্রস্থান, অথবা পুরনো আনুগত্যে ফেরা। মধ্যবিত্ত ভোটার একবার ব্যালটে প্রতিবাদ করেছে। জবাব না পেলে বাকি থাকে দুটো পথ।
এনসিপি তৃতীয় বিকল্প হতে পারত। কিন্তু দলটি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে থেকে ৩০ আসনে লড়ে ৬টিতে জিতেছে। মধ্যবিত্তের একাংশের চোখে দলটি ইতিমধ্যে একই শিবিরের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত।
তৃতীয় ধারণাটা রেট্রোস্পেক্টিভ ভোটিং (ফিওরিনা, ১৯৮১)। ভোটার আদর্শের চেয়ে ফলাফল দিয়ে বিচার করে, ক্ষমতাসীন দল ব্যর্থ হলে শাস্তি পায়। কিন্তু এই তত্ত্বের সীমাটা এড়ানো যাবে না: এটা ক্ষমতাসীনকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলে, নির্দিষ্ট কাউকে পুরস্কৃত করার কথা বলে না। সেই শাস্তির ফলাফল জামায়াতের দিকে যেতে পারে, ভোটদানে বিরতির দিকে যেতে পারে, আওয়ামী লীগের দিকেও যেতে পারে।
তাই দাবিটা সতর্কভাবে বলা দরকার। এটা প্রমাণ নয় যে মধ্যবিত্ত আওয়ামী লীগের দিকে ফিরবে। এটা একটা কাঠামোগত সম্ভাবনা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক রাতের সংঘর্ষ একটা মাসব্যাপী প্যাটার্নের অংশ। সেই প্যাটার্নের পেছনে একটা নির্বাচিত সরকার আছে, যার শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে হেফাজতের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছে, আর যার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাধাদানকে এলাকার বৈশিষ্ট্য বলে বর্ণনা করেছেন। যে এমপি এই কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। তাতেও আক্রমণ থামেনি।
উনিশ আগস্ট রাতে মাদ্রাসার ছাত্ররা পুলিশকে বলেছিল, শব্দ কমাও। সাতাশ আগস্টে যে এমপি জোরে বলার চেষ্টা করলেন, ঊনত্রিশ আগস্টে তাঁকেই বলতে হলো, দুঃখিত। ক্ষমতাসীনদের ভুল কয়েক দিনের সমঝোতায় মিটে যায়। ক্ষমতার বাইরে থাকাদের ভুল ক্ষমা চাইলেও পিছু ছাড়ে না।
সাম্প্রতিক সংবাদ

নিষিদ্ধ আ.লীগ-সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ মামলার মূল আসামি নোবেল এখনও ইত্তেফাকের সাংবাদিক!

ওয়াই-ফাই এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে মুফতি জয়নাল আবেদিন কাদেরী ও ডা. নাবিলের দাবিগুলো কতটা সত্য!

ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হামলা, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে চাপ

সময় টিভির আগস্ট মাসের ‘সম্পাদকীয়’ টকশোতে বিএনপির অতিথি ৩৬, জামায়াত ১৩, এনসিপি ১১

