'এক মিনিট বিদ্যুৎ বন্ধ হলেই আমেরিকায় লাখ লাখ ধর্ষণ' শিবির নেতার এমন দাবির ভিত্তি কী?

"ইউএসএর ব্যাপারে একটা এনালাইসিস হয় যদি এক মিনিট বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে তারা আশংকা করেন কয়েক লক্ষ রেইপ ছড়াই যাইতে পারে, ধর্ষণ কয়েক লক্ষ ছড়াই যাইতে পারে যদি মিনিট দুয়েক, মিনিট পাঁচেক বা একটা পোর্শন যদি বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে।"
২৫ আগস্ট ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর উত্তরের এ+ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এমন মন্তব্য করেন ডাকসু জিএস ও ইসলামি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ। । বক্তব্যটি দৈনিক বাংলা ২৪ Doinik Bangla 24 নামক একটি ফেইসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়।
দুই মিনিটের সেই ক্লিপে পাওয়া ফরহাদের বক্তব্য ছিলো এমন-
“ইউএস-এর ব্যাপারে একটা এনালাইসিস হয়—যদি এক মিনিট বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে, তারা আশঙ্কা করেন যে কয়েক লক্ষ রেপ ছড়াই যাইতে পারে, ধর্ষণ কয়েক লক্ষ ছাড়াই যেতে পারে। যদি এক মিনিট, দুই মিনিট বা পাঁচ মিনিট—একটা পোর্শন যদি বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে, তারা এই ভয় পায়।
তারা শুধুমাত্র সমাজটাকে টিকাইয়া রাখছে জায়গায় জায়গায় ক্যামেরা দিয়ে। জায়গায় জায়গায় ক্যামেরা, সিকিউরিটি সিস্টেম, রেকর্ড হবে, বিচার হবে।
আপনি চীনে যান, চীনের বেইজিংয়ে দেখবেন, পুরাটা নিয়ন্ত্রিত। কোন ব্যাটা কোন রুম থেকে কোন রুমে যাচ্ছে, সব রেকর্ড হয়। কোন মানুষ কই থেকে কই যাচ্ছে, সব রেকর্ড হয়। ফলে কেউ ভয়ে ক্রাইম করে না।
বেইজিং থেকে কিছু দূরে গিয়ে আরেকটা শহরে যান, আরেকটা গ্রামে যান। দেখবেন এখানে চুরি, খুন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট—সব ক্রাইম হচ্ছে। কেন হচ্ছে? কারণ হচ্ছে, তারা কিছু জায়গায় ক্যামেরা দিয়ে ঠেকায় রাখছে। যে জায়গায় ক্যামেরা নাই, ও জায়গায় সব ক্রাইম হয়।
বিপরীতে আমরা যখন দেখি, আমাদের পূর্বপুরুষদের যুগে, ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর আমলে কিংবা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাদিয়াল্লাহু তাআলা রহমাতুল্লাহ আমলে, আমরা খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে আপনি দেখবেন কিংবা সর্বশেষ ওসমানী খেলাফতের সময় দেখবেন, মানুষজন দরজা খোলে রেখে ঘুমায় যাইতেন, ভয় পেতেন না।
তার বক্তব্যের আলোচিত দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্রে খুব অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলেও ব্যাপক হারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দাবির পেছনে বাস্তব কোনো গবেষণা, পরিসংখ্যান কিংবা সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তি আছে কি?
প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড ব্যবহার করে সার্চ করলে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকা এবং একই সময়ে লাখ লাখ ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে সরাসরি কোনো পরিসংখ্যানগত সম্পর্কের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তবে শুধু কোনো গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না, এটুকু দিয়ে বিষয়টি শেষ করে দেওয়া যায় না। দাবিটির বাস্তবতা বোঝার জন্য বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বড় দুটি বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের দিকে তাকানো যেতে পারে।
গ্রেট নর্থইস্ট ব্ল্যাকআউট
১৯৬৫ সালেও বিদ্যুৎ ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়ে আমেরিকা। ওই বছর ৯ নভেম্বর সন্ধ্যার মুখে আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয় যা 'গ্রেট নর্থইস্ট ব্ল্যাকআউট' নামে পরিচিত। এই বিপর্যয়ের কারণে সমগ্র নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য, তার আশেপাশের সাতটি অঙ্গরাজ্যের কিছু অংশ এবং পূর্ব কানাডার বিস্তীর্ণ এলাকা সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। প্রায় ১৩ ঘন্টা এসব অঞ্চল বিদ্যুৎহীন ছিলো। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার মূল কারণ ছিল কানাডার ওন্টারিওর কাছে বিকেল ৫:১৬ মিনিটে একটি ২৩০ কিলোভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বিকল বা ট্রিপ হওয়া, যার ফলে অন্যান্য অতিরিক্ত লোড থাকা লাইনগুলোও একের পর এক বিকল হতে শুরু করে । এটি এমন একটি বিদ্যুতের তীব্র ঢেউ তৈরি করে যা পশ্চিমাঞ্চলীয় নিউ ইয়র্কের সঞ্চালন লাইনগুলোকে কাবু করে ফেলে এবং একের পর এক অতিরিক্ত লাইন বিকল করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরো উত্তর-পূর্ব বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্কটিকে ভেঙে ফেলে।
এই ব্ল্যাকআউটের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটটি অঙ্গরাজ্য এবং কানাডার ওন্টারিও ও কুইবেক প্রদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষ সরাসরি বিদ্যুৎহীনতার শিকার হয়েছিলেন । এই বিদ্যুৎ বিপর্যয়টি ঠিক অফিস ছুটির সময়ে শুরু হওয়ায় লাখ লাখ কর্মজীবী যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েন, যার মধ্যে প্রায় ৮ লাখ মানুষ নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে রেলের ভেতরে এবং আরও হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন অফিস বিল্ডিং, এলিভেটর ও ট্রেনের মধ্যে আটকা পড়েছিলেন । পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ১০,০০০ ন্যাশনাল গার্ড এবং ৫,০০০ অফ-ডিউটি পুলিশ অফিসারকে জরুরি ভিত্তিতে ডেকে তাৎক্ষণিক ডিউটিতে নিয়োজিত করা হয়েছিল।
তবে ১৯৭৭ সালের ব্ল্যাকআউটের মতো এখানে কোনো সহিংসতা, ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। বরং এটি ছিল নিউ ইয়র্ক সিটির ইতিহাসের অন্যতম শান্তিপূর্ণ এবং কম অপরাধের একটি রাত।
নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (NYPD) তথ্য অনুযায়ী, পুরো ব্ল্যাকআউটে মাত্র ৫টি লুটপাটের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, যা ছিল সিটির ইতিহাসে যেকোনো রাতের তুলনায় সবচেয়ে কম অপরাধের রেকর্ড। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে লিফট বা এলিভেটর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিঁড়ি ব্যবহার করতে গিয়ে মাত্র দুইজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। অন্ধকার রাতে লাখ লাখ মানুষ সাবওয়ে ও এলিভেটরগুলোতে আটকা পড়লেও কোনো আতঙ্ক বা বিশৃঙ্খলা ছড়ায়নি, বরং মানুষ মোমবাতি ভাগাভাগি করে এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আমেরিকা এই রাতকে একটি অনন্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ রাত হিসেবে স্মরণ করে।
নিউইয়র্ক ব্ল্যাকআউট
১৯৭৭ সালের ১৩ জুলাই আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটিতে ২৫ ঘন্টা বিদ্যুৎ ছিলো না। এই ঘটনা নিউ ইয়র্ক সিটি ব্ল্যাকআউট নামে আলোচিত। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্যুৎ সংযোগের সাথে নিউ ইয়র্ক গ্রিডের দুর্বলতা। একই সময়ে কনসোলিডেটেড এডিসন কোম্পানির তিনটি প্রধান বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিকল হয়ে পড়ায় এবং শহরের ওপর দিয়ে একটি তীব্র বজ্রঝড় বয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে ।
এই আকস্মিক অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা, লুটপাট ও সহিংসতা। সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে পুরো শহরে অন্তত ১,০৩৭টি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা ফায়ারফাইটারদের সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেক স্থানে আগুন নিজে থেকেই নিভে যাওয়ার জন্য ফেলে রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন নিউইয়র্ক মেয়র আব্রাহাম বিম প্রায় ২৫,০০০ জরুরি কর্মীকে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন, যদিও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তাদের অর্ধেকই পৌঁছাতে পারেননি ।
পরে রাজ্য পুলিশের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং ঘটনার পর ৪,০০০-এর বেশি লুটপাটকারীকে গ্রেফতার করা হয় । বিদ্যুৎ না থাকার সুযোগ নিয়ে হওয়া এই সহিংসতায় প্রায় ৪০০ জন পুলিশ অফিসার এবং ষাট জন ফায়ারফাইটার আহত হন। পুরো বিপর্যয় এবং লুটপাটের কারণে নিউ ইয়র্ক সিটির আনুমানিক ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তবে উৎসগুলোতে এ ঘটনায় কোনো মানুষের প্রাণহানি কিংবা ধর্ষণের মতো অপরাধের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়নি।
দুটি বিদ্যুৎ ব্ল্যাকআউটের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেলে কোনো কোনো পরিস্থিতিতে অপরাধ, বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা বাড়তে পারে, ১৯৭৭ সালের নিউইয়র্ক ব্ল্যাকআউট তার একটি উদাহরণ। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেই, কিংবা মাত্র কয়েক মিনিট বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলেই, যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লাখ ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়বে, এমন কোনো পরিসংখ্যানগত বা সমাজতাত্ত্বিক সম্পর্ক এই ঘটনাগুলো থেকে পাওয়া যায় না। বরং ১৯৬৫ সালের ঘটনা দেখায়, দীর্ঘ সময় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদ্যুৎহীন থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিলো। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুটি ব্ল্যাকআউটের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে বলা যায় ‘কয়েক মিনিট বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলেই কয়েক লাখ ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়বে’ এমন ধারণার পক্ষে বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায় না।
সাম্প্রতিক সংবাদ

নিষিদ্ধ আ.লীগ-সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ মামলার মূল আসামি নোবেল এখনও ইত্তেফাকের সাংবাদিক!

ওয়াই-ফাই এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে মুফতি জয়নাল আবেদিন কাদেরী ও ডা. নাবিলের দাবিগুলো কতটা সত্য!

ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হামলা, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে চাপ

সময় টিভির আগস্ট মাসের ‘সম্পাদকীয়’ টকশোতে বিএনপির অতিথি ৩৬, জামায়াত ১৩, এনসিপি ১১

