বাংলাদেশ লেন্স

মাহফুজ আলমের রাজনীতি নিয়ে এনসিপি নেতার প্রশ্ন, পাল্টা জবাব অল্টারনেটিভস নেত্রীর

সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তার সংগঠন অল্টারনেটিভসকে নিয়ে তোপ দাগিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত। রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ তোলেন- গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা মাহফুজ আলম বর্তমান সরকারের সংস্কার বিরোধী অবস্থান স্বত্তেও সরকারের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নেননি।

গত শনিবার মাহফুজ আলমের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম অল্টারনেটিভস দেশের অবস্থা শিরোনামে একটি প্রেস মিটের আয়োজন করে। সেখানে মাহফুজ ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। সিফাতের অভিযোগ, এই দফাগুলোতেও সরকারের সংস্কার বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করা হয়নি। বরং এগুলোতে সরকারে মৃদু সমালোচনা ও কার্যত সরকারকে কিছু উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সালেহ উদ্দিন সিফাতের পোস্টের প্রতিক্রিয়া এসেছে অল্টারনেটিভস থেকেও। প্লাটফরমটির সংগঠক আনিকা তাহসিনা এক ফেসবুক পোস্টে সিফাতের তোলা অভিযোগগুলো খন্ডন করেছেন। আনিকা যুক্তি দিয়েছেন, প্রেস কনফারেন্সের ভাষার তীব্রতা দিয়ে একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মকে মূল্যায়ন করা অনুচিত। তার ভাষায়, একটা সংগঠনের “মূল্যায়ন হয় তার রাজনৈতিক লক্ষ্য, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি দিয়ে। কোনো নতুন সংগঠন প্রথম দিন থেকেই প্রতিদিন সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার আক্রমণ চালাবে এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।”

সালেহ উদ্দিন সিফাত তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন, “পুরা সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যমান কাঠামোর প্রধান কর্তা তথা সরকারের কোনো জোর সমালোচনা কি দেখেছেন? জ্বালানী, বিদ্যুৎ ও সার সংকটে জনগণের জীবন ওষ্ঠাগত। নাগরিক দূর্ভোগের এই পয়েন্টগুলোতে সরকারের ভূমিকার কোনো কড়া সমালোচনা ছিল কি? আমি দেখি নাই। আর সমালোচনা করে থাকলেও সেটা প্রমিনেন্ট আকারে মিডিয়ায় হাজির হয় নাই। যেখানে 'সিভিল সোসাইটি'ও কড়া ভাষায় সরকারের পুরোনো কাঠামোয় প্রত্যাবর্তন ও সংস্কার বিরোধী পলিসি নিয়ে তুলোধুনা করছে, সেখানে মাহফুজ আলম কর্তৃক সরকারকে স্রেফ উপদেশ দিতে দেখা যাচ্ছে।”

সংস্কার বিষয়েও অল্টারনেটিভস শক্ত ভূমিকা নিচ্ছে না অভিযোগ তুলে সিফাত লিখেছেন, “অল্টারনেটিভ বলছে- "সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা দিতে হবে।" প্রথম দিনই সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয় নাই। বিরোধী জোট নিয়েছিল। গণভোটের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকার 'সংবিধান সংশোধন কমিটি' নামে একটা হাস্যকর জিনিস গঠন করে। কিন্তু বিরোধী জোট তাতেও সমর্থন দেয় নাই। সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সচিবালয় বাতিল করেছে সরকার। মানবাধিকার কমিশনও অকার্যকর এবং দুদকে কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়নি প্রায় ১৬৬ দিন। এতো এতো সংস্কার বিরোধী অবস্থান গ্রহণের পরও অল্টারনেটিভের উপরোক্ত দফা পড়লে মনে হবে কোনো এক দাদা নাতিকে উপদেশ দিচ্ছেন।”

মাহফুজ আলম শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে জানান, সংসদীয় দলগুলোর বাইরে থাকা রাজনৈতিক প্লাটফরমগুলোকে সাথে নিয়ে একটি নন-পার্লামেন্টারি মোর্চা গঠন করার চেষ্টা করছেন তিনি। সিফাত দাবি করেন এই মোর্চাটি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে বরং বিরোধী দলের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিবে।

তার ভাষায়, “উনারা 'নন-পার্লামেন্টারি একটা মোর্চা' গঠনের কথা বলছেন। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে, পার্লামেন্টারি দলগুলো পুরোনো বন্দোবস্তের হিস্যা। (আন্দাজ করি এই মোর্চার প্রধান মাহফুজ আলমই হবেন।) যাকগে, এই মোর্চার প্রধান কাজ পুরোনো কাঠামোকে ভাঙ্গা। কিন্তু মাহফুজ আলমের রাজনৈতিক ভূমিকায় মনে হচ্ছে- তিনি এই প্ল্যাটফর্মকে সরকারের মৃদু সমালোচক এবং মূলতঃ 'বিরোধীদল বিরোধী' একটা ফ্রন্ট বানাতে চাচ্ছেন। কিন্তু প্যাটার্নটা বেশ পুরোনো ও সেকেলে।”

অল্টারনেটিভস কি একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম নাকি সিভিল সোসাইটি প্লাটফর্ম- সে প্রশ্ন তুলে সিফাত আরও লিখেছেন, “সরকার ইতোমধ্যে সংস্কার বিরোধী হিসাবে প্রমাণিত। এখন হবে সমালোচনা, পর্যালোচনা ও প্রতিবাদ। কিন্তু না; সরকারের কাছে নতুন রূপরেখা চায় অল্টারনেটিভ! তারা আরো বলছে - মানবাধিকার কমিশন, গুম ও এসআরবি আইনে নাগরিক অধিকার সুরক্ষা করার কথা। উপরোক্ত তিনটা ক্ষেত্রেই সরকার সংস্কার বিরোধী ও নাগরিক অধিকার খর্বকারী হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনকে নখদন্তহীন কাগুজে বাঘে পরিণত করা হয়েছে। গুম প্রতিরোধে আপাতঃ ভালো একটা অধ্যাদেশকে ল্যাপ্স করে দেওয়া হয়েছে। RAB বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি ও দাবি করে নতুন মোড়কে RABকে আরো শক্তিশালি করা হচ্ছে। RAB নিয়ে প্রধান প্রধান সমালোচনাগুলোকে আমলেই নেওয়া হয় নাই। নাগরিক অধিকার খর্ব হচ্ছে তা প্রমাণিত সত্য। এরপরও সমালোচনা ও প্রতিবাদের জায়গায় উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন তারা। ফলে এটা কি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম না সিভিল সোসাইটি প্ল্যাটফর্ম তা ফারাক্ব করা কষ্ট হচ্ছে।”

অল্টারনেটিভসের সংগঠক আনিকা তাহসিনা সিফাতের এসব অভিযোগ খন্ডন করে লিখেছেন, “যদি সত্যিই সরকার সংস্কারবিরোধী হয়, তাহলে আরও বেশি প্রয়োজন একটি বিকল্প সংস্কারের রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরা। শুধু প্রতিবাদ রাষ্ট্র পরিবর্তন করে না; বিকল্প রাজনৈতিক প্রস্তাবই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। অল্টারনেটিভ “সংবিধান ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা দিতে হবে” বলেছে। এটিকে কেউ “উপদেশ” বলতে পারেন, কিন্তু রাজনীতিতে এটিই তো দাবি (demand politics)। বিরোধী দলগুলো প্রতিদিন সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি তোলে। দাবি তোলা মানেই সরকারকে সমর্থন করা নয়।”

অল্টারনেটিভসের অবস্থানকে মৃদু সমালোচনা বলে সিফাত যে অভিযোগ করেছেন সেটিকে খন্ডন করে আনিকা লিখেছেন, “সমালোচকের পুরো লেখাজুড়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, তিনি অল্টারনেটিভকে বিচার করছেন, কিন্তু একই মানদণ্ডে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও বিচার করছেন না। যদি সরকারের সমালোচনার মাত্রাই একমাত্র মাপকাঠি হয়, তাহলে দেশের প্রায় সব বিরোধী দলই কোনো না কোনো সময়ে সেই পরীক্ষায় ফেল করবে। তাহলে কি সবাই সরকারপন্থী?”

মাহফুজের নন-পার্লামেন্টারি মোর্চার ধারণাকে সিফাত যেভাবে “বিরোধীদলবিরোধী ফ্রন্ট” বলে সাব্যস্ত করেছেন সেটিকে সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর বলে খারিজ করেছেন আনিকা। তার ভাষায়, “কোনো সংগঠন গঠনের আগেই তার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেওয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়। সরকারকে সমালোচনা করা এবং একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা এই দুই কাজ একসঙ্গে করা সম্ভব। গণতন্ত্রে সরকার যেমন জবাবদিহির আওতায় থাকবে, তেমনি বিরোধী শক্তিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাই কেউ যদি একই সঙ্গে সরকার ও প্রচলিত বিরোধী রাজনীতির সমালোচনা করে, সেটিকে “সরকারের দালালি” বলে উড়িয়ে দেওয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়; এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, সরকারবিরোধী না হলে অবশ্যই সরকারপন্থী।”

তিনি আরও লিখেন, “রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অল্টারনেটিভের সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে, কিন্তু সেই সমালোচনা হওয়া উচিত তাদের বাস্তব রাজনৈতিক কার্যক্রম, সংগঠন, আন্দোলন ও ভবিষ্যৎ অবস্থানের ভিত্তিতে। প্রথম সংবাদ সম্মেলনের ভাষার তীব্রতাকে একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে পুরো রাজনৈতিক প্রকল্পকে বাতিল করে দেওয়া বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ না। গণতন্ত্রে প্রয়োজন শক্তিশালী সরকার, শক্তিশালী বিরোধী দল এবং শক্তিশালী নাগরিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। নতুন কোনো প্ল্যাটফর্মকে তার প্রথম দিনের বক্তব্য দিয়েই চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় নয়। এগুলো পুরাতন আবেগের বহিঃপ্রকাশ।”

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত এক সময় মাহফুজ আলমের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সিফাতের পোস্টের নিচে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, অল্টারনেটিভস ও মাহফুজ আলমকে নিয়ে সিফাতের সমালোচনাই বরং প্লাটফর্মটির প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করছে।

এনসিপির আরেক যুগ্ম সদস্যসচিব হুমায়রা নূর লিখেছেন, “অল্টারনেটিভ কে প্রাসঙ্গিক করে রাখার জন্য আপনার অবদান অনস্বীকার্য, আপনি আসলেই ভীষন মেধাবী।”

ইশরাক ফারহান হিমেল নামের একজন মন্তব্য করেছেন, “ভাই অলটারনেটিভস কে বাঁচিয়েই রাখছেন আপনি মাঝেমধ্যে ক্রিটিসাইজ করে। বাদ দেন।”

ফেরদৌস আইয়াম নামের একজন লিখেছেন, “আপনি অল্টারনেটিভসের ত্রাতা। স্বীকার করেন এটা?”

প্রসঙ্গত, গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সরকার থেকে পদত্যাগ করার পর জামায়াতের সাথে জোট করায় এনসিপিতে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক পর্ষদের একাধিক সদস্য বেঙ্গল লেন্সকে জানিয়েছেন, এনিসিপি যেন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সাথে জোটে না গিয়ে বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয় সে চেষ্টা চালিয়েছিলেন তিনি। সেসময় এ বিষয়টি গণমাধ্যমের খবরেও প্রকাশিত হয়।