গত ৩০ মে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বাধায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করা হয়েছিল।
গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইনে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির আগমন আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ ৩০ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আহত হন।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুব এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলামের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে নবীনবরণ উপলক্ষ্যে ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় কনসার্ট বন্ধের দাবি জানায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।
সেই স্মারকলিপিতে বলা হয়, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম, ইলম, আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি জনপদ। জেলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত। অতীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন কনসার্ট ও গানের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফলে নতুন করে এ ধরনের আয়োজন ঘিরে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে।’
স্মারকলিপিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের উল্লেখ করা হয়, গত ২২ আগস্ট সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এরকম যে গান-বাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো আরকি। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা।'
পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুবের বাসভবনে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে ‘সমঝোতা বৈঠকে’ বসে কলেজ কর্তৃপক্ষ। বৈঠকে কলেজের প্রধান ক্যাম্পাসে নবীন বরণ, আলোচনা সভা ও বৃক্ষরোপন কর্মসূচি এবং কোনো ‘অশ্লীলতা হবে না’ শর্তে বিকল্প ভেন্যু হিসেবে কলেজের দক্ষিণ ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এরই প্রেক্ষিতে ১৪ সেপ্টেম্বর কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সঙ্গে সমঝোতার পর বিকল্প ভেন্যুতে আয়োজিত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের নবীনবরণ কনসার্ট। এদিন বিকেলে কলেজের দক্ষিণ ক্যাম্পাসে শ্রোতা মাতাতে উপস্থিত ছিলো ব্যান্ড ‘হাইওয়ে’। যেখানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উৎসুক জনতারও ঢল নামে। ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় গানের তালে তালে মেতে উঠেছেন হাজার হাজার উদ্দাম স্রোতা। তিল ধারণের ঠাঁই নেই সরকারি কলেজের দক্ষিণ ক্যাম্পাস।
কনসার্টের ভিডিও শেয়ার করে সুমন আহমাদ নামে একজন লিখেছেন, “ফাইনালি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট হইলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কিছু হুজুর হাজির হয়েছিলেন অনুষ্ঠান বন্ধ করার মহান মিশন নিয়া।
প্রথম কথা: এই হুজুরদের একটু কমনসেন্স আপডেট করা দরকার। এই দেশে কি শরীয়াহ কায়েম হইয়া গেছে যে, দেশের প্রতিটা প্রতিষ্ঠান এখন থেকে তাদের ব্যক্তিগত ফিকহ অনুযায়ী চলবে? রাত-দুপুরে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা কিংবা কোনো স্পেসিফিক অনৈতিক আয়োজন হইলে আপত্তির জায়গা অবশ্যই আছে। কিন্তু একটা স্কুল-কলেজের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান, যেখানে সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে নাচ-গান আছে সেটা বন্ধ করতে হুজুরদের কোন ম্যান্ডেট দেওয়া হইছে? বাংলাদেশ কোন সিস্টেমে চলছে তারা কি বুঝে না! আজব!”
আসলাম বেগ সায়েম নামে একজন কনসার্টের ভিডিও শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৌলবাদীদের হুমকি উপেক্ষা করে কনসার্ট আয়োজন করলো ছাত্রদল।’
সাদি সাদমান নামে এক বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট লিখেছেন, “আপত্তি উপেক্ষা করেই মঞ্চে ছাত্রদলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কওমি ছাত্র ঐক্যের তোপের মুখেও অনড় আয়োজকরা। গুটিকয়েক টুইন্না মোল্লা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করতে এসেছিল। যারা এমন দুঃসাহস দেখাবে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ তাদের সঠিক জবাব দিয়েছে।”