বাংলাদেশ লেন্স

সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যা, সুইসাইড নোটে লিখে গেলেন সমকাল থেকে পাওনা টাকার কথা

সমকালের কাছে পুলকদার পাওনা রয়েছে। ১৮ বছরের চাকরি জীবনের গ্র্যাচুয়িটি, অর্জিত ছুটি নগদায়নের টাকা পাননি তিনি। কারণ সমকালে চাকরি পরবর্তী পাওনার টাকা পেতে কয়েক বছর লেগে যায়।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে দৈনিক সমকালের ব‌রিশাল অফিস থেকে সাবেক ব‌রিশাল ব্যুরো প্রধান পুলক চ‌্যাটার্জীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পু‌লিশ। এ সময় ৫টি সুইসাইড নোট পাওয়া যায়। যেগুলো পুলক চ‌্যাটার্জী তার স্ত্রী ও মেয়ে, ছোট ভাই দীপক চ‌্যাটার্জী, ব‌রিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জা‌কির হোসে‌ন, দৈ‌নিক সমকালের ব‌রিশাল ব‌্যুরোর দা‌য়িত্বরত সুমন চৌধুরী ও প্রশাসনের উদ্দে‌শে লিখে গেছেন।

পুলক চ‌্যাটার্জীর রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটের মধ্যে বিশেষ ভাবে আলোচনা তৈরি করেছে সমকালের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের প্রসঙ্গটি। সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরো প্রধান ও তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দে‌শ্যে তিনি লিখেছেন, ‘সুমন বিদায়। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন‌্য দুঃখিত। একস‌ঙ্গে প্রায় দেড়যুগ কাজ ক‌রে‌ছি, কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। য‌দি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও।’

পুলকের মৃত্যুর পর গণমাধ্যমকর্মীদের লেখায় বেশকিছু বিষয় সামনে আসে। যার মধ্যে পুলকের অসুস্থতা, চাকরিচ্যুত হওয়া ও হতাশাগ্রস্থ জীবনের নানান দিক উল্লেখযোগ্য।

কেন চাকরি হারিয়েছিলেন পুলক চ্যাটার্জি

দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক রাজীব আহাম্মদ এক ফেসবুক পোস্টে পুলক চ্যাটার্জির চাকরি হারানোর কারণ, হতাশা, অসুস্থতা ও পাওনা টাকা নিয়ে জটিলতার বিষয়ে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেন, “পুলক চ্যাটার্জি সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালে মে মাসে সমকাল যখন তাঁকে অব্যহতি দেয়, আমি সেদিন বরিশালে। চিঠিটা যখন পৌছায়, আমি সামনে বসা। যদিও আগে থেকে জানতাম না, কিন্তু আমার জন্য বিব্রতকর ব্যাপার ছিল। পুলকদাকে কী কারণে সমকাল বাদ দিয়েছিল তা ধারনা করতে পারি। শারীরিক অসুস্থতা, বয়সের কারণে স্থবিরতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় কর্তৃপক্ষ তাঁকে আর বেশি বেতনে রাখতে চাইছিল না। কাজের গতি বাড়াতে আগে দু-একবার নোটিশ করেছিল।

বরিশালের সমকাল কার্যালয় একটি ফ্ল্যাট বাড়ি। দুটি ঘর। বড় ড্রয়িং রুমের পর বাথরুম রান্নাঘরের পর একটি ঘর। তাতে বসতেন পুলক দাদা। আরেকটিতে বসতেন সুমন চৌধুরী ভাই এবং মনির ভাই। পুলকদার পর সুমন ভাই ব্যুরো প্রধান হন।

২০২৩ সালের মে এবং জুন মাসে দিন পনেরো বরিশাল ছিলাম। অব্যহতির পরেরদিন পুলক দাদা আমাকে একান্তে ডেকে বলেছিলেন, ‘এই বয়সে আর কোথাও সময় কাটানোর জায়গা নেই। শারীরিক ব্যাথা বেদনা নিয়ে বাসায় শুয়ে বসে দিন কাটালে আয়ু ফুরাবে। তাই চাকরি না থাকলেও আগের নিয়মে অফিসে আসতে চান। আমি যেনো বিষয়টি ঢাকায় না জানাই।’ লজ্জায় জিভ কেটে বলেছিলাম, ‘সমকালে চাকরি থাকুক বা নাই থাকুক, বরিশাল অফিস তো আপনারই।’

চাকরি না থাকলেও পুলক দাদা দুপুরেই অফিসে চলে আসতেন। রাতে ১০টা পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকতেন। আড্ডা দিতেন। তিনি যে আর সমকালে নেই, এটা আমরাও বাইরের কাউকে বুঝতে দিতাম না। পুলক দাদার যে বড় চেয়ার ছিল, তাতে আমরা কেউ বসতাম না। সমকালের বরিশাল অফিসের সহকারী দীপক দাদা। পুলকদার ভক্ত। দীপকদা ঠিক আগের নিয়মেই অফিসে ঢোকা মাত্র পুলকদাকে চা করে নিতেন।

নির্বাচনের পর ঢাকায় চলে আসি। মাঝেমাঝে ফোনে কথা হত পুলকদার সঙ্গে। একবার শুনলাম কোথায় যেনো জয়েন করেছেন। কয়েকদিন পরে শুনলাম, সেখানে আর নেই। সুমন ভাইয়ের কাছে খবর পেতাম, আবার আগের মত পুলকদা সমকাল অফিসে আসেন, দীর্ঘ সময় নিয়ে পত্রিকা পড়তেন, সময় কাটান। পুলকদার কাছে অফিসের একটা চাবিও আছে।

তো সেই চাবি নিয়ে পুলক দাদা আজ যথারীতি অফিসে আসেন। এরপর কয়েকটি চিঠি লেখেন। একটি স্ত্রী ও মেয়ের কাছে, বাকিগুলো প্রেস ক্লাব, পুলিশ, সুমন ভাই ও দীপক দাদার কাছে। এরপর তাঁর ঝুলন্ত দেহ পাওয়া গেছে অফিসে। সুমন ভাই বিকেলে অফিসে এসে, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পেয়ে অনেকক্ষন ডাকাডাকি করেন। এরপর জানালা দিয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখেন। মানে পুলকদা আর নেই। এরপর পুলিশ এসে দরজা ভেঙে পুলকদার দেহ উদ্ধার করেছে। সুসাইড নোট এবং অফিসে সিসিক্যামেরা রয়েছে।

নোটে পুলকদা লিখে গেছেন, চিকিৎসার পরও শারীরিক অসুস্থতার যন্ত্রনা, অবসাদের এই পথ বেছে নিয়েছেন। সুমন ভাইয়ের উদ্দেশ্যে চিঠিতে লিখে গেছেন, সমকালের কাছে উনার পাওনা আদায় করে বৌদিকে দিতে। হ্যাঁ এটা সত্য, সমকালের কাছে পুলকদার পাওনা রয়েছে। তবে বেতন বা ভাতা বকেয়া নয়। ১৮ বছরের চাকরি জীবনের গ্র্যাচুয়িটি, অর্জিত ছুটি নগদায়নের টাকা পাননি। সমকালে চাকরি পরবর্তী পাওনার টাকা পেতে কয়েক বছর লেগে যায়।

পুলকদার ওপর ২০২৪ সালের আগস্টে হামলা হয়েছিল একটি গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ঘটনা হল, ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট উনার বাড়িতে হামলা করেছিল সন্ত্রাসীরা। এই হামলার পর মির্জা ফখরুল সাহেব বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়েছিলেন।

যাই হোক পুলদকার এই মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সাংবা‌দিক‌দের দুরাবস্থার উদাহরণ। রিপোর্টাররা ২০-৩০ বছর ধরে নিউজের পেছনে ছুটতে ছুটতে শেষ পর্যন্ত নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। বন্ধু স্বজন সবাইকে হারিয়ে ফেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায়। চলাফেরার শক্তি কমে আসার আগেই কেউ যদি রিপোর্টার থেকে বস পর্যায়ে যেতে না পারেন, তাহলে বোঝায় পরিণত হন। কোনো প্রতিষ্ঠানই বয়স্ক রিপোর্টার রাখতে চায় না। ফলে চাকরি হারানো পরিণতি।

যেহেতু তরুণ বয়সে বন্ধু, স্বজন, পরিবারকে ছেড়ে সংবাদের পেছনে ছুটেছে; তাই বেকার হওয়ার পর সঙ্গ দেওয়ার কেউ থাকে না। ফলে একাকীত্ব থেকে অবসাদে ভুগে। আবার যেহেতু অধিকাংশ সাংবাদিকদের বেতনও যতসামান্য, তাই ওই আর্থিক নিরাপত্তাও থাকে না চাকরি হারানোর পর। এখন যারা তরুণ রিপোর্টার মাঠে রয়েছে, পুলকদার মৃত্যু তাদের জন্য সতর্কবার্তা।”

সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর ঘটনা শেয়ার করে প্রথম আলোর সাংবাদিক রাফসান গালিব লিখেছেন, ‘সাংবাদিকেরা যতটা সাহসী হবার কথা, এই দেশের সাংবাদিকেরা ততটাই ভীরু। নয়ত কত কত সাংবাদিক এইভাবে ঝুলে পড়ত!’

লেখক জুয়েইরিয়াহ মউ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘আর এই বাংলাদেশে কিছু বলতেও ইচ্ছা করে না। এতো দমবন্ধ লাগে! এতো দমবন্ধ লাগে!’

পুলক চ্যাটার্জির বাকি ৪টি সুইসাইড নোটে যা লেখা ছিল

১- প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা সুইসাইড নোটে পুলক উল্লেখ ক‌রে‌ছেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলাম না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ‌ইন্ডিয়ার ভেলো‌রে পর্যন্ত ডাক্তার দে‌খিয়ে‌ছি।কিন্তু সুস্থ হতে পা‌রি‌নি। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে।শরীরের যন্ত্রনাকালে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কো‌নো প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।”

WhatsApp Image 2026-09-12 at 12.34.52 AM

২- পুলক স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃ‌তির উদ্দে‌শে লিখেছেন, “আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃ‌থিবীতে কারো জন‌্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃ‌তি তু‌মি পড়াশোনা ও গান শেখা চা‌লিয়ে যেও। প্রিয়াংকা আমার অনুপ‌স্থি‌তি তোমার জীবনে পূরণ হবার নয়। তারপরও কারো জন‌্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সাথে থেকো। দীপক তোমাকে আগলে রাখবে।”

a7b1f856-1857-4e5a-b961-b114a37ac08b

৩- বরিশাল প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এসএম জা‌কির হোসেনকে পুলক চ‌্যাটার্জী লিখেছেন, “বিদায়। তোমার সাথে আমার অনেক স্মৃ‌তি। আমার মরদেহ হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নাই। পারলে মাঝে মাঝে তোমার বৌ‌দি ও প্রকৃতির খোঁজ নিও।”

৪- ভাই দীপক ও দীপকের স্ত্রী ইতির উদ্দে‌শে পুলক লিখে‌ছেন, “বিদায়। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে আগলে রা‌খিস। তোর ওপর অনেক বড় বোঝা চা‌পিয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। ‌মু‌ক্তিযুদ্ধের ভাতা ও আমার ব‌্যাংক হিসাবের ব্যাপারে দেবাশীষের সাথে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াংকা ও প্রকৃ‌তিকে তোর কাছে রা‌খিস।”

সাংবাদিক পুলক দৈ‌নিক সমকাল ব‌রিশাল ব‌্যুরো প্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালের মে মাসে তি‌নি চাকরিচ‌্যুত হন। এছাড়াও তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কার্যনির্বাহী ক‌মি‌টির সি‌নিয়র সদস‌্য ছি‌লেন।