Bengal Lens
লেন্স এক্সপ্লেইনার

বিএনপির দাবিটি অসত্য, সরকারের ৬ মাসে হয়েছে ৭ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড

বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের অর্জন তুলে ধরে দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখন শূন্যের কোঠায়’। তবে ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টার (ক্রিডো) ও মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে এই দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের অর্জন তুলে ধরে দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ থেকে পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখন শূন্যের কোঠায়’।

ওই পোস্টে আরও বলা হয়, "নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বর্তমানে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত করা, আইনের শাসন সুদৃঢ় করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত প্রতিটি সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ফলশ্রুতিতে এই ধরনের ঘটনার হার প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।"

তবে ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টার-ক্রিডো'র প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বিএনপি সরকারের ৬ মাসে ৭টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ১৭ আগস্ট ক্রিডো প্রকাশিত ‘সরকারের ছয় মাসে সাত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে অন্তত সাতটি মৃত্যুর ঘটনা- আসকের বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুসংক্রান্ত পরিসংখ্যানে এসেছে।

ক্রিডো জানিয়েছে, তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তি আসকের নিয়মিত মানবাধিকার পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে জুলাই পর্যন্ত আসকের ‘Extra Judicial Killings and Custodial Death’ শ্রেণিতে ৮টি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। এর একটি পুলিশ হেফাজতে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ায় সেটি বাদ দিয়ে গুলি বা নির্যাতনের অভিযোগ থাকা সাতটি ঘটনা প্রতিবেদনে রাখা হয়েছে।

যে ৭টি ঘটনার তথ্য দিয়েছে ক্রিডো

হ্লামংনু মার্মা, বান্দরবান: ২৩ ফেব্রুয়ারি রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জেএসএসের গোলাগুলির ঘটনায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। সেনাবাহিনীর ভাষ্য, সশস্ত্র সদস্যদের গুলির জবাবে পাল্টা গুলি চালানো হয়েছিল।

1

আব্দুল হামিদ, নওগাঁ: ৪ মার্চ মহাদেবপুরে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ছেলেকে ধরতে যাওয়া পুলিশ তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে টানাহেঁচড়া ও লাথি দেয়। পরে তিনি মাটিতে পড়ে মারা যান

2

আকুব্বর মোল্লা, মাগুরা: ১২ এপ্রিল মহম্মদপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানের সময় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে মারধর করা হয়েছিল। তবে অধিদপ্তর অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

3

আমিনুর রহমান গাজী, সুন্দরবন: ১৮ মে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন। সঙ্গীদের অভিযোগ, বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রল দলের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। বন বিভাগের দাবি, ধস্তাধস্তির সময় অস্ত্র থেকে গুলি বেরিয়ে যায়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হয়।

4

মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ, ফরিদপুর: ২১ জুন ডিবি পুলিশের হাতে আটকের পর তাঁরমৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল; পুলিশ তা অস্বীকার করে। পরে তাঁর আটকের ভিডিও ও পুলিশের মামলার এজাহারের মধ্যে অসঙ্গতির তথ্যও সামনে আসে।

5

শওকত সরদার, খুলনা: ২৫ জুন সুন্দরবনের কয়রা এলাকায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে তিনি নিহত হন। কোস্ট গার্ডের দাবি, বনদস্যুদের সঙ্গে গোলাগুলির সময় তিনি মারা যান। আসক ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতায় মৃত্যুর তালিকায় রেখেছে।

6

মিজানুর রহমান, চাঁদপুর: ৩০ জুলাই ফরিদগঞ্জে পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি, থানায় নেওয়ার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়। আসক ঘটনাটিকে ‘Death by Physical Torture (after arrest)’ শ্রেণিতে নথিভুক্ত করেছে বলে ক্রিডো জানিয়েছে।

7

আসকের হিসাবেও সংখ্যা শূন্য নয়

ক্রিডোর প্রতিবেদনের প্রধান তথ্যসূত্র আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটির ১০ আগস্ট প্রকাশিত ‘Death by Law Enforcement Agencies Jan-Jul 2026’ পরিসংখ্যানে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার সংশ্লিষ্টতায় মোট ১৩টি মৃত্যু নথিভুক্ত রয়েছে।

এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে সাতটি, ‘শুটআউট’ এ চারটি, একটি ‘ক্রসফায়ার’ এবং একটি হেফাজতে আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে। তবে ১৩টি ঘটনার সবগুলো বর্তমান সরকারের মেয়াদে নয়। ক্রিডো ১৭ ফেব্রুয়ারির পরের সময় আলাদা করে সাতটি ঘটনা শনাক্ত করেছে।