Bengal Lens
মিডিয়া লেন্স

মেজর জাহিদকে নিয়ে দুই বিপরীত বয়ান: প্রথম আলোর একাধিক সূত্র, যুগান্তরের এর ভরসা একটি অভিযোগ

গত ৩১ জুলাই (২০২৬) দৈনিক যুগান্তর তাদের শেষ পাতায় ‘জ/ঙ্গি নাটক সাজিয়ে মেজর জাহিদকে হত্যা, সত্য জানাই হলো কাল’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। অন্যদিকে, প্রথম আলো ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ‘আড়াই বছর আগে উগ্রবাদে জড়ান মেজর জাহিদ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

যুগান্তরের সংবাদটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম আলোর সংবাদটির তুলনা করে ব্যাপক সমালোচনা করা হচ্ছে। দুটি সংবাদকে একসাথে রেখে তৈরি করা একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে 'প্রথম আলো একটি নিরীহ পরিবারকে ধ্বংস ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে বৈধতা দিয়েছে'।

এই বিতর্কের প্রেক্ষিতেই সংবাদ দুটির বস্তুনিষ্ঠতা, ফ্রেমিং ও ব্যবহৃত সূত্রসমূহ বিশ্লেষণ করেছে ‘বেঙ্গল লেন্স’।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুগান্তরের সংবাদটি মূলত ট্রাইব্যুনালে করা একটি অভিযোগ ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে প্রথম আলোর সংবাদটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র, আইএসপিআর, পরিবার, বন্ধু ও অন্যান্য নথিপত্র মিলিয়ে বেশ কয়েকটি সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন: সূত্রের বৈচিত্র্য বনাম সরকারি বয়ান-নির্ভরতা

প্রথম আলোর প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য ছিল, 'মেজর (অব.) জাহিদ ও তাঁর স্ত্রী জেবুন্নাহার আইএ/স মতাদর্শে বিশ্বাসী নব্য জেএ/মবির সদস্য হিসেবে ‘হিজরত’ করার কথা বলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন। জাহিদ তাঁর স্ত্রীকেও জ/ঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।'

সংবাদে এই দাবির পক্ষে সূত্র ছিল 'জ/ঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র'। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র দিয়ে আরও দুটি দাবি করে প্রথম আলো।

একটি হলো- "জাহিদ জেএমবিতে ‘মেজর মুরাদ’ বা ‘জাহাঙ্গীর’ ছদ্মনামে সক্রিয় ছিলেন। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলাকারী জ/ঙ্গিদের তিনি গাইবান্ধার চরে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।"

এছাড়া “পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে প্রথম আলো জানায়, 'গুলশান হা;মলার অন্যতম ‘সমন্বয়কারী’ তামিম চৌধুরীর সাথে জাহিদের ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং কানাডার ভয়ংকর জ/ঙ্গি গ্রুপ ‘ক্যালগ্যারি ক্লাস্টার’-এর সাথেও তাঁর যোগাযোগ ছিল।"

আবার জাহিদের আচরণ নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, "২০১৩ সাল থেকে জাহিদের আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করে এবং তখন থেকেই তিনি তাঁর পুরোনো বন্ধুবান্ধব ও চেনা জগৎ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন।" এমন দাবির বিষয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সূত্র ছিলো "জাহিদের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু"৷

এদিকে "২০১৪ সালের জুন মাসে জাহিদ একটি প্রশিক্ষণে ছয় মাসের জন্য কানাডায় যান। ফিরে আসার পর তাঁর মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি দাড়ি রাখেন, সেনাবাহিনীর রেশন নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং পরে চাকরি ছেড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বেতনে একটি বেসরকারি স্কুলে যোগ দেন।" এমন দাবির সূত্র ছিলো জাহিদের শ্বশুর মো. মমিনুল হক।

এছাড়া "নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরীর ভাড়া বাসায় তল্লাশি চালিয়ে একটি ভাড়াটে তথ্য ফরম পাওয়া যায়, যাতে ‘জাহাঙ্গীর আলম’ নাম লেখা ছিল। এর সূত্র ধরেই রূপনগরের বাসার সন্ধান মেলে। পুলিশ ধারণা করে, জাহিদ রূপনগরের বাসায় সাংগঠনিক কাগজপত্র সরাতে এসেছিলেন, কারণ সেখান থেকে কিছু পোড়া কাগজ ও তাঁর মেয়ের স্কুলের ডায়েরি (যেখানে তাঁর আসল নাম ছিল) উদ্ধার করা হয়।" এমন দাবির বিষয়ে সূত্র ছিলো প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এবং পুলিশের ধারণা।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন পড়লে দেখা যায়, সেখানে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাইরেও মেজর (অবঃ) জাহিদের জ/ঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আরও তিনটি সোর্স তারা ব্যবহার করেছে। যথা, জাহিদের শ্বশুর, বন্ধু, ইমিগ্রেশন ডকুমেন্ট।

প্রথম আলোর এই প্রতিবেদনে জাহিদের কানাডা যাওয়া, দাড়ি রাখা, চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা পরিবারের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো তথ্যগুলো পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সূত্র থেকে নেওয়া হলেও, তাকে সরাসরি 'জ/ঙ্গি' বলা , 'মেজর মুরাদ' ছদ্মনাম ব্যবহার বা 'ক্যালগ্যারি ক্লাস্টার'-এর সাথে যুক্ত থাকার মতো গুরুতর ও মূল অভিযোগগুলোর পুরোটাই দাঁড়িয়ে ছিল "নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের" তথ্যের ওপর। ক্রাইম রিপোর্টিংয়ে স্বাধীন যাচাই-বাছাই ছাড়া কেবল সরকারি ন্যারেটিভের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সাংবাদিকতার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা।

যুগান্তরের প্রতিবেদন: অভিযোগ নির্ভর একপেশে বয়ান

অন্যদিকে গত ৩১ জুলাই যুগান্তরের প্রতিবেদনে যে দাবিগুলো করা হয়েছিল সেগুলোর সূত্র মাত্র একটি, এবং তা হলো- মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা অভিযোগ। যুগান্তর বলছে, গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর পৃথক অভিযোগ করেন মেজর (অব.) জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার।

যুগান্তরের সংবাদে "পিলখানা হ/ত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততার তথ্য জেনে ফেলাই মেজর (অব.) জাহিদের জন্য কাল হয়েছিল। সেই 'সত্য জানার অপরাধেই' বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে টার্গেট করে এবং পরে জ/ঙ্গি নাটক সাজিয়ে নির্মমভাবে হ/ত্যা করে।"

"মেজর জাহিদকে হ/ত্যার আগে রাত ১০টার দিকে তাঁর স্ত্রী জেবুন্নাহার ও দুই শিশুসন্তানকে চো/খ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাদের ডিবির ‘আয়নাঘরে’ ৪ মাস ৭ দিন গু/ম করে রাখা এবং স্বামী ও নিজেকে 'জ/ঙ্গি' বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য জেবুন্নাহারের ওপর ডিবি কার্যালয়ে শারীরিক ও মানসিক নি/র্যাতন চালানো হয় এবং মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া হয়।" এই দাবিরও সূত্র সেই জেবুন্নাহার ইসলামের নিজের বক্তব্য এবং ট্রাইব্যুনালে করা তার অভিযোগ।

যুগান্তর প্রতিবেদনটিকে এমনভাবে উপস্থাপন বা 'ফ্রেমিং' করেছে যেন এটি তাদের নিজস্ব কোনো গভীর অনুসন্ধান। একটি নির্দিষ্ট পক্ষের (অভিযোগকারীর) বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে যাচাই-বাছাই না করে প্রমাণিত সত্য হিসেবে সরাসরি শিরোনামে (‘সত্য জানাই হলো কাল’) নিয়ে আসা সাংবাদিকতার নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি মূলত একটি আদালত বা ট্রাইব্যুনাল রিপোর্টিং, যাকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বেঙ্গল লেন্সের পর্যবেক্ষণ

সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, ২০১৬ সালে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া বয়ানের বাইরে গিয়ে স্বাধীন অনুসন্ধান করতে পারত না বা করত না। ফলে প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে সরকারি বয়ানের আধিপত্য স্পষ্ট।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে বিপরীত একটি বয়ানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতাও যুগান্তরের এই রিপোর্টে দৃশ্যমান।

বেঙ্গল লেন্সের বিশ্লেষণে এটি প্রতীয়মান হয় যে, যুগান্তরের এই একক-সূত্র ও অভিযোগ-নির্ভর প্রতিবেদন দিয়ে প্রথম আলোর একাধিক সূত্রে করা প্রতিবেদনটিকে (যতই তার পদ্ধতিগত দুর্বলতা থাকুক) সরাসরি 'মিথ্যা' বা 'ভিত্তিহীন' দাবি করা সাংবাদিকতার মানদণ্ডে এখনই সম্ভব নয়।

মেজর (অব.) জাহিদের জ/ঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ছিল, নাকি তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ ও রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শিকার ছিলেন—তা আলাদা, নিরপেক্ষ ও গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। বেঙ্গল লেন্স এখানে মেজর জাহিদের অপরাধ বা নির্দোষিতার কোনো উপসংহার টানেনি, বরং মিডিয়া ওয়াচের নিয়ম অনুসরণ করে আলোচিত দুটি প্রতিবেদনের বস্তুনিষ্ঠতা ও সূত্র ব্যবহারের ধরনটি পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।