Bengal Lens
মিডিয়া লেন্স

ভারতের দ্বিচারিতা: খালেদার আইনজীবীকে বাধা, হাসিনার জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা!

পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা | সংগৃহীত

শেখ হাসিনার বক্তব্যে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ইতিপূর্বেও ভারতকে অবহিত করে। ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে বৈঠকে ইউনুস মোদিকে অনুরোধ করে বলেন, শেখ হাসিনা যেন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না করেন। উনি বিভিন্ন কর্মসূচির দিনক্ষণ বলেছেন, তাতে বাংলাদেশে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া নামক একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফোরামের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা। এই সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণার পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলে বাংলাদেশ। ঢাকা সতর্ক করে বলেছে, একজন পলাতক আসামিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দিলে তা উন্নয়নশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় নয়াদিল্লি সংবাদ সম্মেলনটিকে একটি ‘বেসরকারি আয়োজন’ বলে দাবি করেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MEA) বর্তমান মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে জানান যে, এই আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সংযোগ বা সম্পৃক্ততা নেই এবং সেখানে শেখ হাসিনা যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন, তার সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্মতি বা সমর্থন নেই। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে দলটির দাবির মুখে ভারত সরকার তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীকে দিল্লিতে প্রেস ব্রিফিং করতে দেয়নি।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন কারাবন্দি বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে ব্রিফিং করতে যাওয়া ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড অ্যালেক্স কার্লাইলকে দিল্লি বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠিয়েছিল ভারত সরকার।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের ১১ জুলাই খালেদা জিয়ার আইনি দলের সদস্য এবং যুক্তরাজ্যের প্রবীণ আইনজীবী লর্ড কার্লাইল কিউসি ভারতে আসেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল দিল্লিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে খালেদা জিয়ার মামলার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রূপ এবং বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব নিয়ে কথা বলা।

তবে তার এই সফরের এক সপ্তাহ আগেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে কার্লাইলের সফরের বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ জানায় এবং তাকে ভিসা না দেওয়ার অনুরোধ করে। ঢাকা থেকে আসা এই রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করে ১২ জুলাই ভোরে লর্ড কার্লাইলকে দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে দেয় ভারত সরকার এবং সেখান থেকেই তাকে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানো হয়।

তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার দাবি করেছিলেন যে, কার্লাইলের ভিসার আবেদন এবং ভারতে এসে তার কাজ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং তিনি ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে এসেছিলেন।

তবে লর্ড কার্লাইল ভারতের এই পদক্ষেপকে চরম লজ্জাজনক উল্লেখ করে বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের চাপে পড়ে দাসত্ব করছে। হাউস অব লর্ডসের একজন সদস্যের সঙ্গে যা করা হলো, তা লজ্জাজনক। ভারত সরকার ভালো করেই জেনেই আমাকে ভিসা দিয়েছিল। পরে হাসিনা সরকারের অনুরোধে ভিসা নাকচ করা হয়।’ (সূত্র: আনন্দবাজার)

উক্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘আমরা মনে করি, এই ঘটনাটি ভারতের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’ (সূত্র: ডেইলি স্টার)

শেখ হাসিনার বক্তব্যে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ইতিপূর্বেও ভারতকে অবহিত করে। ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে বৈঠকে ইউনুস মোদিকে অনুরোধ করে বলেন, শেখ হাসিনা যেন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না করেন। উনি বিভিন্ন কর্মসূচির দিনক্ষণ বলেছেন, তাতে বাংলাদেশে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।

তবে ইউনুসের অনুরোধের জবাবে নরেন্দ্র মোদি বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।' (সূত্র: এবিপি আনন্দ)

এ ছাড়া নির্বাচনের পূর্বে ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া' দিল্লিতে 'সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক একটি সেমিনার আয়োজন করেছিল। সেখানে সশরীরে এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রী ও নেতা হাজির ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানেই শেখ হাসিনার একটি রেকর্ড করা অডিও ভাষণ বাজানো হয়েছিল।

এ ব্যাপারে ঢাকার জবাবদিহিতার প্রশ্নে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলছিলেন, ‘ভারতে তো বাক্‌স্বাধীনতা আছে। ভারত সরকার তা ঠিক করে দিতে পারে না যে কে কী কথা বলবেন। কোন সময়ে কে মুখ খুলবেন, কী বলবেন, সেটা ভারতের সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তো হয় না! যিনি কথা বলতে চাইছেন, সেটা তার নিজের সিদ্ধান্ত।’ (সূত্র: বিবিসি বাংলা)

গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, ২০১৮ সালের কার্লাইলের ঘটনা এবং বর্তমান শেখ হাসিনার পরিস্থিতি আইনগতভাবে এক নয়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ। তখন ভারত রাষ্ট্রীয় ডিসক্রিশন ব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক কার্যক্রম ঠেকিয়েছিল, আর এখন বাক্‌স্বাধীনতার যুক্তি দিচ্ছে। ফলে ভারতের অবস্থানে ধারাবাহিকতার প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বাক্‌স্বাধীনতার যুক্তি কি অজুহাত; প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি একে পুরোপুরি অজুহাত বলব না, তবে এটি একটি সিলেক্টিভ আর্গুমেন্ট বলে মনে হতে পারে। রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই বাক্‌স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার নীতিকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করে। ভারতের ক্ষেত্রেও এখানে সেই রাজনৈতিক বিবেচনার উপস্থিতি অস্বীকার করা কঠিন।

ভারত কেন শেখ হাসিনাকে প্রাধান্য দিচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফ বলেন, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে। দিল্লি সম্ভবত এখনো তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক একজন অ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যক্তির চেয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়াই ভারতের জন্য বেশি কার্যকর হবে।